ছড়িয়ে পড়ছে রোহিঙ্গারা, নিরাপত্তা ঝুঁকিতে বাংলাদেশ


4-5

রাখাইন রাজ্যে নতুন করে হত্যা-বিতাড়ন অভিযান শুরু হওয়ার পর থেকে প্রাণ বাঁচাতে রোহিঙ্গা শরণার্থীর ঢল নেমেছে বাংলাদেশে। সংকট সৃষ্টির শুরু থেকে বাংলাদেশ সরকার নতুন করে আর কোনো রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিতে অপারগতা জানালেও মানবিক কারণে পরবর্তীতে তাদের আশ্রয় দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। তবে মিয়ানমার থেকে আগত রোহিঙ্গারা ছড়িয়ে পড়ছে বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে, যা দেশকে সামজিক-অর্থনৈতিক এমনকি নিরাপত্তগত বিপর্যয়ের মুখে ঠেলে দিতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা।

গত ২৫ আগস্ট রাখাইনে সেনা অভিযান শুরু হলে রোহিঙ্গারা বাংলাদেশে প্রবেশ করতে শুরু করে। ঘটনার প্রথম দিকে রাখাইন পরিস্থিতির ভয়াবহতা কেউই আঁচ করতে পারেনি। কিন্তু পালিয়ে আসা শরণার্থীরা ঢল, নির্যাতন বিষয়ে তাদের বর্ণনা এবং গোয়েন্দা প্রতিবেদনে কল্পনাতীত সংখ্যক শরণার্থী বাংলাদেশে প্রবেশ করতে পারে বলে সর্তক করা হয়। কিন্তু এ বিষয়ে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের আগেই এত শরণার্থী প্রবেশ করে যে, হঠাৎই শরণার্থী ব্যবস্থাপনা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। তা ছাড়া প্রাণ বাঁচাতে পালিয়ে আসা মানুষের প্রয়োজনীয় খাদ্য-পানীয়, বাসস্থান-স্যানিটেশন ও চিকিৎসা সামগ্রীর অভাব এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অপ্রতুলতার সুযোগে রোহিঙ্গারা সারা দেশে ছড়িয়ে পড়তে শুরু করেছেন।

রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশের নিরাপত্তার জন্য ঝুঁকি বলে উল্লেখ করছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম। ১৮ সেপ্টেম্বর সোমবার কলকাতার আইসিসিআরের সত্যজিৎ রায় মিলনায়তনে ‘আজকের বাংলাদেশ’ শীর্ষক আলোচনা সভায় পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, রোহিঙ্গা সমস্যা মানবিক সংকট হিসেবে দেখা দিলেও এটি বাংলাদেশের নিরাপত্তার ক্ষেত্রে ঝুঁকি রয়েছে। বাংলাদেশে বর্তমানে প্রায় আট লাখ রোহিঙ্গা অবস্থান করছে। তবে এদের সঙ্গে সন্ত্রাসবাদীদের যোগ সম্পর্কে সরকারের কিছু জানা নেই।

বিশেষজ্ঞদের মতে, রোহিঙ্গাদের সাথে বাংলাদেশের মানুষের ভাষা-সংস্কৃতি-চেহারা ইত্যাদির মিল থাকায় তারা অতি সহজেই কক্সবাজার ছেড়ে বিভিন্ন উপায়ে বাংলাদেশে গ্রামগঞ্জে ছড়িয়ে পড়ছেন। যা দেশের জন্য বিপদ বয়ে আনতে পারে বলে মন্তব্য করে এখনই সতর্ক হওয়ার পরামর্শ দেন তারা।

গত ১৩ সেপ্টেম্বর বুধবার যাশোরের বেনাপোল সীমান্ত থেকে দুই পরিবারের মোট ৮ জন রোহিঙ্গাকে আটক করে বিজিবি। ওইদিন বিকেলেই বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি সীমান্তে সন্দেহজনকভাবে ঘোরাঘুরি করার সময় আরও চার রোহিঙ্গাকে আটক করে বিজিবি। ওইদিন রাতে মানিকগঞ্জের সিংগাইর উপজেলার চারিগ্রাম তিন রোহিঙ্গা পরিবারের ২০ জনকে আটক করে পুলিশ। এ ছাড়া গত ১৬ সেপ্টেম্বর শনিবার হবিগঞ্জের মাধবপুরের শাহজিবাজার ট্রেন স্টেশন থেকে সাইফুল ইসলাম (২৮) এক রোহিঙ্গাকে আটক করে কক্সবাজারে ফেরত পাঠিয়েছে পুলিশ।

গণমাধ্যমের খবরে আরও বলা হয়, ২৫ আগস্ট থেকে কক্সবাজার ও বান্দরবানের সীমান্ত দিয়ে পাহাড়ি পথে রোহিঙ্গারা চট্টগ্রামের বিভিন্ন উপজলোয় অবস্থান নিয়েছে। এর মধ্যে রাউজান, বোয়ালখালী, রাঙ্গুনিয়া, হাটহাজারী, ফটিকছড়ি, পটিয়া, বাঁশখালীর বিভিন্ন এলাকায় অসংখ্য রোহিঙ্গারা ছড়িয়ে পড়েছেন।

পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়, এ পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে প্রায় ২০০ রোহিঙ্গাকে আটক করা হয়েছে। এরপর তাদেরকে নির্ধারিত শরণার্থী শিবিরে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, রোহিঙ্গারা যাতে কক্সবাজারের বাইরে গিয়ে দেশের বিভিন্ন এলাকায় সাধারণ মানুষের সঙ্গে মিশে যেতে না পারে সে ব্যাপারে স্থানীয় প্রশাসনকে সতর্ক করা হয়েছে। ঢাকাসহ বিভাগীয় শহরগুলোর প্রবেশমুখেও একাধিক তল্লাশি চৌকি বসানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তা ছাড়া কক্সবাজার থেকে চট্টগ্রামগামী বিভিন্ন বাসে তল্লাশি চালিয়ে আটক রোহিঙ্গাদের টেকনাফে ফেরত পাঠানো হচ্ছে।

তা ছাড়া কোনো রোহিঙ্গা শরণার্থী নির্দিষ্ট শিবিরের বাইরে ছড়িয়ে পড়লে আইন অনুযায়ী অবৈধ ব্যক্তি হিসেবে গণ্য হবেন বলে জানিয়েছেন পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) এ কে এম শহীদুল হক। ১৮ সেপ্টেম্বর সোমবার দুপুরে পুলিশ সদর দফতরে সাম্প্রতিক আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি বিষয়ক আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ কথা জানান।

তিনি বলেন, রোহিঙ্গারা সারা দেশে ছড়িয়ে পড়লে হয়তো এ দেশের নাগরিক হতে চাইবে, নয়তো কাজ করার চেষ্টা করবে। তারা হয়তো কোনো অপরাধে জড়িয়ে পড়বে কিংবা কোনো প্রতারক চক্রের মাধ্যমে অপরাধের শিকার হবেন। রোহিঙ্গারা দেখতে আমাদের মতো হলেও ভাষাগত দিকে এক নয়, তাই ছড়িয়ে গেলে ধরা পড়বেই। বিদেশি নাগরিক অবৈধভাবে আশ্রয় নিলে যেভাবে গণ্য করা হয়, তাদেরকেও তখন সেভাবে গণ্য করা হবে। তবে প্রচলিত আইনে শরণার্থী শিবিরের বাইরে পাওয়া গেলে তাকে গ্রেফতার করে আদালতে পাঠানোর কথা বলা হলেও মানবিক দিক বিবেচনায় তাকে আদালতে না পাঠিয়ে উদ্ধার করে নির্দিষ্ট শিবিরে পাঠানো হবে।

এদিকে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গারা দেশের অভ্যন্তরে ছড়িয়ে পড়লে তা দেশের সামজিক-অর্থনৈতিক-রাজনৈতিক এমনকি নিরাপত্তগত মারাত্মক বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।