সিটিসেলের সিইও মেহবুব চৌধুরী গ্রেফতার


দেশের সবচেয়ে পুরাতন মোবাইল ফোন অপারেটর সিটিসেলের অর্থ আত্মসাতের মামলায় প্রতিষ্ঠানটির সিইও মেহবুব চৌধুরী গ্রফতার করেছে দুদক। গত ২৮ জুন দুদকের উপপরিচালক শেখ আবদুস ছালামের বনানী থানায় অর্থ আত্মসাতের মামলায় শনিবার(গতকাল) বিকেলে শ্রীলঙ্কা থেকে দেশে ফেরার পর শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে তাঁকে গ্রেফতার করা হয়। রোববার তাঁকে আদালতে উপস্থাপন করা হবে বলে দুদক সূত্র জানিয়েছে।

এই মামলায় বিএনপি নেতা ও সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী এম মোরশেদ খান ও তার স্ত্রী ছাড়াও সিটিসেলের ভাইস চেয়ারম্যান আসগর করিম, পরিচালক নাছরিন খান, প্রধান নির্বাহী মেহবুব চৌধুরী; এবি ব্যাংকের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালকদের মধ্যে রয়েছেন কাইজার আহমেদ চৌধুরী, এম ফজলুর রহমান, শামীম আহম্মেদ চৌধুরী, মসিউর রহমান চৌধুরী, এবি ব্যাংকের ক্রেডিট রিস্ক ম্যানেজমেণ্ট ডিপার্টমেন্টের কর্মকর্তা সালমা আক্তার, এক্সিকিউটিভ ভাইস প্রেসিডেন্ট মহাদেব সরকার সুমন, এসভিপি ও রিলেশনশিপ ম্যানেজার সৈয়দ ফরহাদ আলম, আরশাদ মাহমুদ খান, মো. জাহাঙ্গীর আলম, সিনিয়র অ্যাসিসট্যান্ট ভাইস প্রেসিডেন্ট (অপারেশন বিভাগ) শাহানুর পারভীন চৌধুরী, এভিপি ও শাখা ব্যবস্থাপক জার ই এলাহী খান ও  রিলেশনশিপ অফিসার মো. কামারুজ্জামানের নাম রয়েছে।

মামলার এজাহারে বাদী উল্লেখ করেন, এম মোরশেদ খানের প্রতিষ্ঠান প্যাসিফিক টেলিকম বাংলাদেশ লিমিটেড (পিবিটিএল) নিয়ম-কানুন উপেক্ষা করে এবং অসৎ উদ্দেশ্যে এবি ব্যাংকের চারটি বোর্ড সভায় জামানত ছাড়াই ব্যাংক গ্যারান্টি পায়। এর সঙ্গে এবি ব্যাংকের কর্মকর্তারাও জড়িত ছিলেন। এই গ্যারান্টি ব্যবহার করে পিবিটিএল আটটি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে ঋণ নিয়েছে। উল্লিখিত ঘটনার সার্বিক বিশ্লেষণে এটাই প্রমাণিত হয় যে, এম মোরশেদ খান অন্যায়ভাবে আর্থিক লাভের জন্য প্রতারণা, দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার ও অপরাধজনক বিশ্বাস ভঙ্গের মাধ্যমে প্যাসিফিক টেলিকম বাংলাদেশ লিমিটেডের ব্যবসা সম্প্রসারণের লক্ষ্যে ব্যাংক গ্যারান্টির আবেদন করলেও তা কোনো ধরনের যাচাই-বাছাই করা হয়নি।

এজাহারে আরও উল্লেখ করা হয়, দুদকের তদন্তে এবি ব্যাংকের মোট ৩৮৩ কোটি ২২ লাখ ১০ হাজার টাকা আত্মসাতের প্রমাণ পেয়েছে। তাই অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে ১৯৪৭ সালের দুর্নীতি প্রতিরোধ আইনের ৫(২) ধারায় শাস্তিযোগ্য অপরাধ করায় একটি নিয়মিত মামলা করার জন্য অনুরোধ করা হলো।

উল্লেখ্য, ২০১০ সালের প্রথম দিকে সিটিসেলের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা পদে গুরুত্বপূর্ণ রদবদল করা হয়। তখন মেহবুব চৌধুরীকে বানানো হয় প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা। ২০১৬ সালের অক্টোবরে যখন সরকার সিটিসেলের কার্যক্রম বন্ধ করে দেয় তখনও তিনি স্বপদে বহাল ছিলেন।

প্রসঙ্গত, অর্থ সংকটে এবং বকেয়া টাকা পরিশোধ করতে না পারায় গত বছরই বন্ধ হয়ে যায় দেশের প্রথম মোবাইল ফোন প্রতিষ্ঠান সিটিসেল। ২০১৬ সালের ২০ অক্টোবর বিটিআরসি সিটিসেলের স্পেকট্রাম বরাদ্দ স্থগিত করে দিলে সিটিসেল সুপ্রিম কোর্টে আপিল করে। আপিল বিভাগ বিটিআরসিকে স্পেকট্রাম খুলে দেয়ার আদেশ দেন। ৬ নভেম্বরে সিটিসেলের স্পেকট্রাম ফিরিয়ে দেয়া হয়। খুলে দেয়া হয় অপারেটরটির নেটওয়ার্ক অপারেশন সেন্টার (এনওসি)। স্পেকট্রাম ফিরে পেয়ে পুনরায় চালু হওয়া সিটিসেল আর আগের অবস্থায় ফিরতে পারেনি। এখন তাদের এখন আর কোনো গ্রাহকও নেই।

২০১৬ সালের অক্টোবর পর্যন্ত সিটিসেলের কাছে মোট পাওনা ৪৭৭ কোটি টাকা বকেয়া ছিল বলে দাবি বিটিআরসির। তবে এর মধ্যে অপারেটরটি পরিশোধ করেছে ২৫৫ কোটি টাকা। অবশিষ্ট ২২২ কোটি পরিশোধ করলেই অপারেটরটি দায় মুক্ত হবে। ২০১৬ সালের অক্টোবর থেকে ২০১৭ সালের মার্চের মধ্যে সিটিসেলের একটি পেমেন্ট দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু যথা সময়ে তা পরিশোধ করেনি অপারেটরটি।

১৯৮৯ সালে বাংলাদেশ টেলিকম লিমিটেড (বিটিএল) নামে টেলিকম সেবা পরিচালনার লাইসেন্স পায় সিটিসেল। পরের বছর হংকং হাচিসন টেলিকমিউনিকেশন লিমিটেড এ কোম্পানিতে বিনিয়োগ করলে বিটিএল নাম বদলে হয় হাচসন বাংলাদেশ টেলিকম লিমিটেড (এইচবিটিএল)। ১৯৯৩ সালে প্রতিষ্ঠানটির মালিকানায় আবার পরিবর্তন আসে। তখনকার পররাষ্ট্রমন্ত্রী মোরশেদ খানের মালিকানাধীন প্যাসিফিক মটরস ও ফারইস্ট টেলিকম মিলে এইচবিটিএল-এর শেয়ার কিনে নেয়। কোম্পানির নাম বদলে হয় প্যাসিফিক বাংলাদেশ টেলিকম লিমিটেড, ব্র্যান্ডিং শুরু হয় সিটিসেল নামে।

বিএনপি সরকারের সময় এ কোম্পানি একচেটিয়া ব্যবসা করে। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর আরও কোম্পানিকে লাইসেন্স দেওয়া হলে তাদের একচেটিয়া ব্যবসার অবসান ঘটে এবং ব্যবসা পড়তির দিকে যায়। এরপর এই কোম্পানিতে ২০০৪ সালে বিনিয়োগ করে সিঙ্গাপুরের সিংটেল। কিন্তু ব্যবসা আর প্রসার ঘটেনি।

অপারেটরটির ৪৪ দশমিক ৫৪ শতাংশ শেয়ারের মালিক সিঙ্গাপুরের টেলিযোগাযোগ সেবাদাতা কোম্পানি সিংটেল। আর সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও বিএনপি নেতা মোর্শেদ খানের প্যাসিফিক মোটরর্সের রয়েছে ৩৭ দশমিক ৯৫ শতাংশ শেয়ার। এছাড়া ১৭ দশমিক ৫১ শতাংশ শেয়ার রয়েছে ফার ইস্ট টেলিকমের।


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*