যুক্তরাজ্যের ‘ঐতিহাসিক’ নির্বাচনে ভোটগ্রহণ শুরু


যুক্তরাজ্যে ঐতিহাসিক সাধারণ নির্বাচনে ভোটগ্রহণ শুরু হয়েছে। বৃহস্প‌তিবার স্থানীয় সময় সকাল ৭টায় ‌৬৫০টি আসনে শুরু হয় ভোটগ্রহণ, বিরতিহীনভাবে চলবে রাত ১০টা পর্যন্ত। একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ক্ষমতায় যেতে কোনও একটি দলের কমপক্ষে ৩২৬টি আসন জি‌ততে হ‌বে। জ‌রি‌পগুলোতে ক্ষমতাসীন কনজার‌ভেটিভ পা‌র্টির সংখ্যাগ‌রিষ্ঠ আসন জেতার আভাস পাওয়া গেলেও দলটির নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়া নিয়ে সংশয় রয়েছে। ফলে শেষ পর্যন্ত ঝুলন্ত পার্লামেন্ট ব্রিটিশ রাজনীতির গন্তব্য হতে যাচ্ছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ব্রিটেনের সংবাদমাধ্যমগুলো এই নির্বাচনকে ঐতিহাসিক বলছে। তাদের মতে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ব্রিটেন এমন নির্বাচনের মুখোমুখি আর হয়নি। কেননা বৃহস্পতিবারের সাধারণ নির্বাচনের ফলাফলের ওপর দেশটির ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে।

ব্রেক্সিট তথা ব্রিটেনের ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন ত্যাগের প্রশ্নে প্রায় তিন বছর ধরে পার্লামেন্টে যে অচলাবস্থা তৈরি হয়েছিল, তার পরিপ্রেক্ষিতে গত দু’বছরের মধ্যে এটি দ্বিতীয় সাধারণ নির্বাচন। প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসনের কনজারভেটিভ পার্টি একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকারে ফিরতে চাইছে। অন্যদিকে জেরেমি করবিনের নেতৃত্বাধীন লেবার পার্টি ব্রেক্সিটের পরিবর্তে তাদের নানা ধরণের রাষ্ট্রীয় কল্যাণমূলক কর্মসূচিকেই তাদের প্রচারে প্রাধান্য দিচ্ছে।

নির্বাচনী প্রচারণার শুরু থেকেই জনমত জরিপগুলোতে প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসনের কনজারভেটিভ পার্টি এগিয়ে আছে। তারা প্রধান বিরোধী দল জেরেমি করবিনের লেবার পার্টির চেয়ে বিভিন্ন সময় অন্তত ৬ থেকে ১৫ পয়েন্টের বেশি ব্যবধানে এগিয়ে ছিল। তবে শেষের দিনগুলোতে এই ব্যবধান বেশ কিছুটা কমে এসেছে। সবশেষ জরিপে দেখা যাচ্ছে কনজারভেটিভ পার্টিকে ৪৩ শতাংশ এবং লেবার পার্টিকে ৩৩ শতাংশ ভোটার সমর্থন করছে। তবে এসব জনমত জরিপ কতটা নির্ভরযোগ্য তা নিয়ে প্রশ্ন আছে। ব্রিটেনের ইতিহাসে এসব জনমত জরিপের ভবিষ্যদ্বাণী কখনো সঠিক হয়েছে, কখনো ভুলও হয়েছে। নির্বাচনি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ব্যবধান কমে আসার ফলে কনজারভেটিভ পার্টি সবচেয়ে বেশি আসনে জিতলেও সুস্পষ্ট সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পাবার সম্ভাবনা এখন আগের চেয়ে বেড়ে গেছে।

ব্রিটেনের সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটার ২০১৬ সালের গণভোটে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ত্যাগের পক্ষে রায় দেয়। তার আগের কয়েক দশক ধরে ব্রিটেন এবং ইইউ-র অর্থনীতি এবং বাণিজ্য অত্যন্ত ঘনিষ্ঠভাবে সংযুক্ত ছিল। তাই গণভোটের পরই কথা ওঠে যে ইইউ ত্যাগ করার ফলে যাতে অর্থনীতি ও ব্যবসা-বাণিজ্যের কোন ক্ষতি না হয়, দু-অংশের জনগণ চাকরিবাকরি থেকে শুরু করে বিভিন্ন ক্ষেত্রে যেসব সুবিধা ভোগ করতেন সেগুলোতে কোন ছেদ যেন না পড়ে – তাই ব্রেক্সিট কীভাবে হবে তা আগে থেকেই একটা চুক্তির ভিত্তিতে স্থির করে নিতে হবে।

বর্তমান প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন এবং পূর্বসূরী থেরেসা মে এরকম চুক্তি করে এসেছিলেন ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের সাথে। তবে তারা তাদের প্রস্তাবিত চুক্তি পার্লামেন্টে পাস করাতে পারেন নি। পার্লামেন্টে ব্রেক্সিটকে কেন্দ্র করে নজিরবিহীন তিক্ততা,  বিভক্তি ও অচলাবস্থার ধারাবাহিকতায় এই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে। সংকট নিরসনের স্বার্থেই জন্যই নতুন এই নির্বাচন দেয়া হয়েছে – যাতে কোন একটি দল সুস্পষ্ট সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে এসে ব্যাপারটাকে সামনে এগিয়ে নিতে পারে। বলা হচ্ছে, ব্রেক্সিট হবে কিনা বা কীভাবে হবে তা নির্ধারিত হবে এ নির্বাচনে।

ব্রেক্সিটপন্থীরা বলছেন, ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে যুক্তরাজ্য বেরিয়ে আসলে সেখানকার সমাজ ও অর্থনীতিতে এক যুগান্তকারী পরিবর্তন আসবে। বিপরীতে ব্রেক্সিটবিরোধীদের দাবি, এর পরিণতিতে যুক্তরাজ্য ভেঙে যেতে পারে – কারণ স্কটল্যান্ড এবং উত্তর আয়ারল্যান্ডে ব্রেক্সিটের বিরুদ্ধে জোর জনমত আছে। অন্যদিকে ব্রেক্সিটের প্রতিক্রিয়া পড়বে ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের ওপরও – অনেকের মতে ইইউর ঐক্যও হুমকির মুখে পড়তে পারে। এক কথায় গোটা ইউরোপেই অনেক সুদূর প্রসারী পরিবর্তন আসতে পারে। আর এ নির্বাচনের পরিণতিতে ব্রেক্সিট যদি না হয় – তাহলে অনেকের মতে ব্রিটেনে এক গভীর রাজনৈতিক সংকট দেখা দেবে। জনগণের একাংশের মধ্যে গুরুতর বিভক্তি ও অবিশ্বাস সৃষ্টি হবে, রাজনৈতিক ব্যবস্থা ও রাজনীতিবিদদের প্রতি সৃষ্টি হবে জনগণের গভীর অনাস্থা। অনেকে সামাজিক সংঘাতের আশংকাও প্রকাশ করছেন।

জরিপের ফল অনুযায়ী যদি ঝুলন্ত পার্লামেন্টই ব্রিটেনের গন্তব্য হয়, তাহলে যে অনিশ্চিত অবস্থা থেকে বেরুনোর জন্য এ নির্বাচন হচ্ছে – সেই একই অবস্থা ব্রিটেন আবার ফিরে আসতে পারে।