সীমানা পুনর্নির্ধারণে কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়নে ‘ব্যর্থ’ নির্বাচন কমিশন


একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে বড় শহরের আসন সংখ্যা কমানোর পরিকল্পনা ছিল নির্বাচন কমিশনের (ইসি)। কিন্তু সেই কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে ব্যর্থ হয়েছে সাংবিধানিক এই প্রতিষ্ঠানটি।

গত ৩০ এপ্রিল, সোমবার নির্বাচন কমিশন জাতীয় সংসদের ৩০০ আসনের পুনর্নির্ধারিত সীমানার চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশ করেছে। পুনর্নির্ধারিত সীমানা ঘেঁটে দেখা যায়, বড় শহরের সংসদীয় আসন সংখ্যা একটিও কমানো হয়নি।

যদিও কর্মপরিকল্পনায় বলা রয়েছে, ‘জনসংখ্যা, মোট আয়তন ও ভোটার সংখ্যা উভয়কে প্রাধান্য দিয়ে বড় বড় শহরের আসন সংখ্যা সীমিত করে দিয়ে আয়তন, ভৌগোলিক ও প্রশাসনিক অখণ্ডতা বজায় রেখে জাতীয় সংসদ নির্বাচনি সীমানা নির্ধারণ বিষয়টি কমিশনের সক্রিয় বিবেচনায় রয়েছে।’

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন নির্ধারিত সময়ের মধ্যে শেষ করার জন্য সাতটি কর্মপরিকল্পনা হাতে নেয় কমিশন। পরিকল্পনা অনুযায়ী, ৩০০ আসনের সীমানা চূড়ান্ত করে গেজেট প্রকাশের সিদ্ধান্ত ছিল এপ্রিলে। যথা সময়ে সীমানা চূড়ান্ত করতে পারলেও বড় শহরে আসন সংখ্যা কমাতে পারেনি কমিশন।

চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশের আগে ১৪ মার্চ ৪০ আসনে পরিবর্তন এনে সীমানা পুনর্নির্ধারণের খসড়া প্রকাশ করে নির্বাচন কমিশন। বিষয়টি চূড়ান্ত করতে প্রতিষ্ঠানটি গণমাধ্যমের অনুপস্থিতি নিশ্চিত করে ২১, ২৩, ২৪ ও ২৫ এপ্রিল এই বিষয়ে শুনানি করে। ৩০ এপ্রিল চূড়ান্ত তালিকায় ১৭ আসনের ক্ষেত্রে সিদ্ধান্তে স্থির থাকতে পারেনি কমিশন।

নির্বাচন কমিশন পুনর্নির্ধারণী খসড়ায় রাজধানীর পাঁচটি আসনে পরিবর্তন আনে। ঢাকা ২, ৩, ৭, ১৪ ও ১৯ আসনে সেই পরিবর্তনও চূড়ান্ত সীমানা পুনর্নির্ধারণীতে ধরে রাখতে পারেনি ইসি।

পুনর্নির্ধারণ নিয়ে সংলাপের আলোচনা

নির্বাচনি সংলাপে আওয়ামী লীগ বলেছে, সীমানা নির্ধারণের বিষয়টি আদমশুমরারির সঙ্গে সম্পর্কিত। ২০১১ সালের আদমশুমারির ওপর ভিত্তি করে দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সীমানা পুনর্নির্ধারণী হয়েছে। এ রকম পরিপ্রেক্ষিতে নতুন আদমশুমারি ছাড়া আবার সীমানা পুনর্নির্ধারণ করা হলে জটিলতা তৈরি হতে পারে। অন্যদিকে খসড়া প্রকাশের পর দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সীমানা বজায় রাখতে নির্বাচন কমিশনকে বলে আসছিল আওয়ামী লীগ।

১৪ দলীয় জোটের মধ্যে কোনো কোনো রাজনৈতিক দল সরাসরি দশম জাতীয় সংসদের আসনের সীমানার পক্ষে মত দিয়েছে। এগুলোর মধ্যে কোনো কোনো রাজনৈতিক দল নির্বাচনি আসনের সীমানা নিয়ে কথাই বলেনি।

বিপরীতে সংলাপে বিএনপি ২০০৮ সালের আগে সংসদীয় এলাকার যে সীমানা ছিল তা আবার বহাল রাখার পক্ষে মত দেয়। ২০ দলীয় জোটের মধ্যে বেশ কিছু দল ২০০৮ সালের আগের সংসদীয় সীমানার পক্ষে মত দিয়েছে, কিছু মত দেওয়া থেকে বিরত থেকেছে।

সংলাপে সুশীল সমাজ, প্রিন্ট মিডিয়ার প্রতিনিধি ও সাংবাদিক নেতৃবৃন্দ এবং নারী নেত্রীরা সীমানা পুনর্নির্ধারণের পক্ষে মত দিয়েছেন। এদের মধ্যে সুশীল সমাজ ভোটার সংখ্যা অনুপাতে নিয়ে নির্বাচনি এলাকা নির্ধারণ করার কথা জানিয়েছে। সেই সঙ্গে সীমানা নির্ধারণের ক্ষেত্রে আদিবাসীদের বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়ার জন্য বলেছিল তারা।

নারীনেত্রী বলেছে, জাতীয় সংসদ নির্বাচনের জন্য সংরক্ষিত নারী আসনের সীমানা নির্ধারণ করে সরাসরি নির্বাচনের ব্যবস্থা করতে হবে এবং প্রিন্ট মিডিয়ার প্রতিনিধি ও সাংবাদিক নেতৃবৃন্দরা বলেছেন, সংসদের আসনগুলোর সীমানা পুনর্বিন্যাস করার কথা।

পর্যবেক্ষক সংস্থা ও ইলেক্ট্রনিক গণমাধ্যমের প্রতিনিধি ও সাংবাদিকরা আসনের সীমানা নিয়ে কোনো কথা বলেননি।

কর্তৃপক্ষের বক্তব্য

সীমানা পুনর্নির্ধারণ বিষয়টি চূড়ান্ত হওয়ার পর ৩০ এপ্রিল সংবাদ সম্মেলন করে নির্বাচন কমিশন।

সংবাদ সম্মেলনে কমিশনার মো. রফিকুল ইসলাম জানান, আওয়ামী লীগের চাপে নয়, শুনানিতে উপস্থাপিত বিষয়গুলো বিবেচনায় নিয়েই এই পরিবর্তন আনা হয়েছে।

কর্মপরিকল্পনায় বড় শহরের আসন সংখ্যা কমানোর পরিকল্পনা এবং বর্তমান কমিশন দায়িত্ব পাওয়ার পর থেকে বলেও আসছিল নির্বাচনি আসনে বড় ধরনের পরিবর্তন নিয়ে আসবে। কিন্তু তা আসেনি। অন্যদিকে খসড়ায় ৪০ আসনে পরিবর্তন আনার পরও শুনানি শেষে ১৭টি আসনের ক্ষেত্রে এই সিদ্ধান্তে স্থির থাকতে পারেনি কমিশন।

এ রকম পরিপ্রেক্ষিতে রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘আমাদের অনেক বিষয় বিবেচনায় নিয়ে কাজ করতে হয়েছে। আমরা আশা করছি, অক্টোবরের মধ্যে আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সূচি ঘোষণা করব। এর মধ্যে আমাদের সময় আছে মাত্র পাঁচ মাস। এই সময়ের মধ্যে আমরা যদি বড় ধরনের পরিবর্তন আনি, তাহলে সেটা যথাযথ কি না?’

স্বল্প সময়ের কথা ওঠায় এক সাংবাদিক জানতে চান, ‘আপনারা যখন কর্মপরিকল্পনার কথা চিন্তা করেছিলেন, তখন আপনারা বলেছিলেন, একটা নতুন আইন করবেন। সে অনুযায়ী, ব্যাপক আকারে পরিবর্তন আনবেন। এখন এসে বলছেন, টাইম গ্যাপ (স্বল্প সময়)। তাহলে যখন কর্মপরিকল্পনা নিয়েছিলেন, তখন কি স্বল্প সময়ের কথা বিবেচনায় ছিল না?’

উত্তরে নির্বাচন কমিশনার রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘আমরা যে কথা বলেছিলাম, সেখান থেকে সরে আসতেছি না। আমাদের অনেক বিষয় দেখতে হয়। আমাদেরও কিছু সীমাবদ্ধতা আছে। কারণ আমরা অনেক পুরনো তথ্য দিয়ে সীমানা পুনর্নির্ধারণ করতেছি। আইনে পরিবর্তন আনার পরে, এটা অনেক লম্বা বিষয়। বিষয়টি আমরা কোনোক্রমেই মাথা থেকে বাদ দেইনি। আমরা এটা করতে চাই, কাজ করতেছি। আমরা যদি কাজটি শেষ করতে নাও পারি, পরবর্তীতে যারা আসবেন তারা যেন পারেন।’