আরেকটি হৃদয় ভাঙা ফাইনাল


আরেকটি হৃদয় ভাঙা ফাইনাল
 

সেই ২০০৯ সাল থেকে শুরু। ফাইনাল আসে, ফাইনাল যায়। শিরোপা আর ছুঁয়ে দেখা হয় না। ফাইনাল মানেই দুঃস্বপ্ন, ক্ষত-বিক্ষত স্মৃতি। ফাইনাল মানে হারই অমোঘ নিয়তি বাংলাদেশের। ফাইনাল মানে নিঃশ্বাস দূরত্বে থাকা শিরোপাটা ছুঁতে না পারা। এলো আরো একটি ফাইনাল, প্রতিপক্ষ অতি চেনা ভারত। গল্পটাও তাই আগের মতো। আরেকটি দুঃসহ ফাইনাল। চার উইকেটের হৃদয় চূর্ণ করা হারে শিরোপা থেকে গেল অধরাই। নিদাহাস ট্রফির শ্রেষ্ঠত্ব উঠল ভারতের মাথায়।

পুরো ম্যাচে আগুন ঝরানো বোলিং করা রুবেল ১৯তম ওভারে হয়ে গেলেন খলনায়ক। ম্যাচ জিততে শেষ ১২ বলে ভারতের দরকার যখন ৩৪, রুবেল খরচা করলেন ২২ রান। ঠিক খরচা নয়, বাংলাদেশের স্বপ্নকে কাফনে মুড়ে দুটি ছয় ও দুটি চারে ২২ রান তুলে নেন দিনেশ কার্তিক। শেষ ওভারে দরকার ১২ রান। প্রথম পাঁচ বলে উইকেট নেওয়াসহ ৭ রান দেন সৌম্য সরকার। শেষ বলে দরকার ৫ রান। কে জানত ছয় হাঁকিয়ে বাংলাদেশের স্বপ্ন অন্ধকারে ছুঁড়ে মারবেন দিনেশ কার্তিক।

অনেক পাওয়া না পাওয়ার হিসাব কষার ফাইনাল। শুরুটা হলো হার দিয়ে। আর ওই টস হারই যেন বাংলাদেশকে বলে দিলো, এবারো গল্পটা ভিন্ন হবে না। ব্যাটে হাতে বাজে শুরুও তেমন ইঙ্গিত দিচ্ছিল। যদিও সাব্বির রহমানের ব্যাটে ১৬৬ রান তুলে বল হাতে বারবার হুঙ্কার হাঁকিয়ে বুক চিতিয়ে লড়ে গেছেন সাকিব, মুস্তাফিজ, রুবেলরা। তবুও শেষ পরিণতি কান্নায় চোখ ভিজিয়ে।

মনে হতে পারে খেলাটা বুঝি ভারতের মাটিতে! গ্যালারিতে যে গর্জন, সবটাই ছিল ভারতের পক্ষে। টাইগার শোয়েব বা টাইগার মিলনদের সঙ্গে বাংলাদেশ থেকে যাওয়া গোটাকয়েক দর্শকের গলা ফাটানো চিৎকার তাই হয়তো পৌঁছায়নি সাকিব, তামিম, মুশফিক, সাব্বিরদের কানে। কারণ আগের ম্যাচ আর স্নেক ড্যান্স। ফাইনালে নিশ্চিত করার লড়াইয়ে বাংলাদেশের কাছে হেরে তেঁতে উঠেছিলেন লঙ্কানরা। যে কারণে ফাইনালে তারা গলা ফাটিয়েছেন কেবল ভারতের জন্যই।

গ্যালারিতে একটু খেয়াল করলেই সেটা বোঝা যাচ্ছিল। বাংলাদেশের একেকটি উইকেটপতন যেন আনন্দের উপলক্ষ এনে দিচ্ছিল ভারত দলের লঙ্কান সমর্থকদের। ভারতের ব্যাটিংয়ের সময় ব্যাপারটি আরো ভালোভাবে বুঝা গেছে। রোহিত শর্মা-লোকেশ রাহুলদের বাউন্ডারিতে বুনো উল্লাস চলছিল গ্যালারিতে, বাংলাদেশকে ফিরিয়ে দেওয়া হচ্ছিল স্নেক ড্যান্স। কিন্তু ভারতের উইকেট পতনেই গ্যালারি নিস্তব্ধ, পিনপতন নীরবতা। যেন ভারত-শ্রীলঙ্কা দুই দলই প্রতিপক্ষ বাংলাদেশের।

১৬৭ রানের টার্গেটে শুরু থেকেই বাংলাদেশের বোলারদের ওপর চড়ে বসতে চাইলেন ভারত অধিনায়ক রোহিত শর্মা। প্রথম ওভার দেখে খেললেও মেহেদী হাসান মিরাজের করা ইনিংসের দ্বিতীয় ওভারটিতে টর্নেডো বইয়ে দেন রোহিত। দুটি ছয় ও একটি চারে তুলে নেন ১৭ রান। শুরুতেই ভড়কে দেওয়ার যে পরিকল্পনা তাতে সফল ভারত অধিনায়ক। যদিও দলীয় ৩২ রানে পরপর শিখর ধাওয়ান ও সুরেশ রায়নাকে ফিরিয়ে দিয়ে আশার পালে হাওয়া লাগান সাকিব ও রুবেল।

কিন্তু অধিনায়ক রোহিত একপাশ আগলে লোকেশ রাহুলকে নিয়ে এগিয়ে গেছেন। এই জুটি ভারতকে পৌঁছে দিয়েছে ৮৩ রান পর্যন্ত। যদিও এ দুজন ১০০ পেরোনোর আগেই ফিরেছেন। রুবেল ২৪ রান করা রাহুলকে এবং নাজমুল অপু ৫৬ রান করা রোহিত শর্মাকে ফেরান। এরপরই ম্যাচ নতুন মোড় নেয়। দুই ওভার বাকি থাকতে ম্যাচ ঝুলে পড়ে বাংলাদেশের দিকে। কিন্তু ঘাতক হয়ে ওঠা দিনেশ কার্তিক আট বলে ২৯ রান করে জয় কেড়ে নিয়েছেন বাংলাদেশের মুঠো থেকে।

টস জিতলে বাংলাদেশ যা করত, ভারতও তাই করেছে। বাংলাদেশকে আগে ব্যাটিংয়ে পাঠিয়েছেন রোহিত শর্মা। শুরু দেখে মনে হয়েছিল দুই ওপেনার তামিম ইকবাল ও লিটন কুমার দাস দারুণ কিছুই এনে দেবেন। এ আশা গুড়েবাালি হতে সময় লাগেনি। এই দুই ব্যাটসম্যানই একসঙ্গে দিক হারিয়েছেন। দলীয় ২৭ রানে ফিরেছেন লিটন-তামিম দুজনই।

মনে হতে পারে পরপর দুই বলে কিংবা একই ওভারে আউট হয়েছেন লিটন-তামিম। আসলে লিটন এবং তামিমের আউট হওয়ার মাঝে ব্যবধান ছিল পাঁচ বলের। এই পাঁচ বলে কোনো রান আসেনি। লিটন ১১ রান করে ফেরার পর তামিম থেমেছেন ১৫ রান করে। শিরোপা জয়ের যুদ্ধে ব্যাট হাতে এমন শুরুর কারণে চাপে পড়ে যাওয়া ছাড়া উপায় ছিল না।

এই চাপে যখন ধুঁকছিল বাংলাদেশ, তখন সবাইকে হতাশ করে সাজঘরে ফিরেছেন পুরো টুর্নামেন্টে নিজের ছায়া হয়ে থাকা সৌম্য সরকার। ৩৩ রানেই নেই তিন উইকেট। চোখ রাঙিয়ে যাচ্ছিলেন ভারতের বোলাররা। সেটা সামলে সাব্বির রহমানের সঙ্গে দেয়াল তোলার চেষ্টায় নামেন আগের তিন ম্যাচে ব্যাট হাতে ত্রাণকর্তার ভূমিকায় থাকা মুশফিকুর রহিম।

কিন্তু এ দিন দীর্ঘ হয়নি তার লড়াই। দলীয় ৬৮ রানের মাথায় যুবেন্দ্র চাহালের করা অনেক বাইরের একটি ডেলিভারি খেলতে গিয়ে বিজয় শঙ্করের তালুবন্দী হন ৯ রান করা মুশফিক। বাংলাদেশকে লড়াইয়ের পুঁজি এনে দেওয়া সাব্বির আশার আলো ধীরে ধীরে জ্বালিয়ে তুলছিলেন। তাতে সঙ্গী হন বাংলাদেশকে ফাইনালে তোলার নায়ক মাহমুদউল্লাহ রিয়াদ।

এই জুটিতে যেন প্রাণ ফিরে পায় বাংলাদেশের ইনিংস। ঝিমিয়ে পড়া ইনিংস এই জুটিতেই চাঙ্গা হয়ে ওঠে। বেড়ে যায় রানের গতি। মাহমুদউল্লাহ রয়েসয়ে খেললেও টি-টোয়েন্টি স্পেশালিস্টের মতোই খেলছিলেন সাব্বির। দারুণভাবে এগিয়ে যাওয়া এই জুটির অপমৃত্যু হয়েছে ভুল বোঝাবুঝির কারণে। রান আউট হয়ে থামতে হয়ে ২১ রান করা মাহমুদউল্লাহকে।

সাব্বির বুঝতে পেরেছিলেন যা করার তাকেই করতে হবে। ক্ষেপাটে হয়ে ওঠেন ডানহাতি এই ব্যাটসম্যান। তাণ্ডব চালান ১৮.২ ওভার পর্যন্ত। তাতে সাব্বিরের নামের পাশে যোগ হয়েছে টি-টোয়েন্টি ক্যারিয়ারের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ৭৭ রান। ৫০ বলের ইনিংসটি সাতটি চার ও চারটি ছক্কায় সাজিয়েছেন সাব্বির। তখন মনে হয়েছিল ১৫০ ছাড়িয়ে থামবে বাংলাদেশ। কিন্তু হঠাৎ রণমূর্তি ধারণ করা মেহেদী হাসান মিরাজ মাত্র সাত বলে ১৯ রান করে বাংলাদেশকে ১৬৬ রানে পৌঁছে দেন।


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*