ভবিষ্যতে কমবে না গ্যাস সংকট, প্রতিবছর বাড়বে


BC-21-01-16-N_43(1)

দীর্ঘ সময় চেষ্টা করেও চুলায় আগুন জ্বালানো সম্ভব হচ্ছে না। চুলায় আগুন না জ্বলায় রান্না বন্ধ। সেইসঙ্গে বন্ধ খাওয়া-দাওয়া। বাইরের হোটেল থেকে খাবার কিনে কিংবা ঘরে থাকা শুকনো খাবার খেয়ে বেরিয়ে পড়তে হচ্ছে কাজে। তবুও দেরি হয়ে যাচ্ছে চাকরিজীবীর অফিসে যেতে, শিক্ষার্থীদের স্কুল-কলেজে যেতে। গ্যাস চাপ কম থাকায় রাজধানীর প্রায় এলাকায়ই এমন সমস্যায় পড়ছেন নগরবাসী। গ্যাস নেই, চুলা জ্বলছে না। আর এর প্রভাব পড়ছে দৈনন্দিন কাজে। এই সমস্যা শুধু রাজধানী ঢাকাতেই নয়। চট্টগ্রাম, নারায়ণগঞ্জসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় এখন গ্যাস সংকটের কারণে ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে গ্রাহকদের। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই গ্যাস সংকট কমার কোনো সুযোগ নেই। অবৈধ সংযোগ বেড়ে যাওয়া, গ্যাসের মজুদ কমে যাওয়া ইত্যাদি কারণে এখন থেকে প্রতিবছর এ সংকট বাড়বে। এমন ইঙ্গিত দিয়েছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদও। সম্প্রতি তিনি বলেছেন, ‘আগেই বলেছি আবাসিক খাতে গ্যাসের সমস্যা থাকবে। আমরা চাইছি, যারা গ্যাস ব্যবহার করছেন আর যারা করছেন না তারা যেন ধীরে ধীরে এলপি গ্যাসে চলে যান’। শীতের শুরু থেকেই দেশজুড়ে গ্যাস সংকট দেখা দিয়েছে। বাসাবাড়িতে গ্যাসের কারণে দুর্ভোগে পড়ছেন নগরবাসী। ঢাকা ও চট্টগ্রাম মহানগরে এবার সংকটের তীব্রতা সবচেয়ে বেশি। পরিস্থিতি এতই নাজুক হয়েছে যে, ভোর থেকেই গ্যাস উধাও হয়ে যাচ্ছে। আসতে আসতে সন্ধ্যা লেগে যাচ্ছে। কোথাও কোথাও গভীর রাত ছাড়া গ্যাস মিলছে না। ফলে অনেক এলাকায় দৈনন্দিন রান্নার কাজ একেবারেই থেমে গেছে। কেউ কেউ খাবারের জন্য হোটেলে ছুটছে। রাজধানী ঢাকার প্রায় সব এলাকায় এ পরিস্থিতি। শুক্রবার সরকারি ছুটির দিনে বাসা বাড়িতে কিছুটা দেখা মিললেও সংকট ছিল সিএনজি ফিলিং স্টেশনগুলোতে। রাজধানীর অধিকাংশ স্টেশনে গ্যাস না পেয়ে ফিরে যেতে দেখা গেছে গ্রাহকদের। আবার অনেক স্টেশনে সামনে গিয়ে দেখা গেছে, গাড়ির দীর্ঘ লাইন। অনেক সময়ই কিছু কিছু ফিলিং স্টেশনকে বন্ধ থাকতে দেখা গেছে। রাজধানীর লালবাগ, আজিমপুর, মালিবাগ, বাড্ডা, মগবাজার, বনশ্রী, শান্তিনগর, মিরপুর, মোহাম্মদপুর, পোস্তগোলা, বাসাবো, সবুজবাগ ও খিলগাঁওসহ বেশিরভাগ এলাকায় এখন গ্যাসের সরবরাহ অনেক কম থাকায় চরম ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে। কোথাও কোথাও কিছুটা গ্যাস সংকট থাকলেও গত কয়েকদিনের তুলনায় এখন স্বস্তি ও কথাই জানালেন নগরবাসী। রাজধানীর শান্তিনগরে থাকেন মাহফুজা। বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরিজীবী স্বামী আর কলেজপড়ুয়া মেয়েকে নিয়ে তার সংসার। তাদের জন্য নাশতা বানাতে ঘুম থেকে উঠেই মাহফুজাকে চুলার কাছে দৌঁড়াতে হয়। সকালের নাশতার পালা শেষ না হতেই শুরু হয় দুপুরের রান্নার জোগাড়। কিন্তু সম্প্রতি তার বাঁধাধরা কাজের ছন্দে ছেদ পড়েছে। বেশ কিছুদিন ধরে এ এলাকায় গ্যাসের তীব্র সংকট চলছে। ভোর থেকে বিকাল ৩টা পর্যন্ত গ্যাসের চাপ থাকে না। নিভু নিভু উনুনে সকালের নাশতাও বানানো সম্ভব হয় না। রান্না করার মতো গ্যাস আসতে আসতে বিকেল হয়ে যায়। শুক্রবার রাজধানীর কল্যাণপুরের রহমান ফিলিং স্টেশন, মিরপুর দারুস সালামের পূর্বাচল ও যমুনা ফিলিং স্টেশন, এস এস ফিলিং স্টেশন, জয়কালী মন্দির রোডের সিএনজি স্টেশন, সাত মসজিদ রোডের সাউদার্ন সিএনজি স্টেশনসহ বেশ কয়েকটি স্টেশনে গিয়ে দেখা যায়, গাড়ির দীর্ঘ সারি। চাপ কম থাকায় গ্যাস দিতে অনেক বেশি সময় লাগছে বলে দায়িত্বরত কর্মচারীরা জানান। শুধু রাজধানী ঢাকায় নয়, গ্যাসের তীব্র সংকট চলছে সাভার, নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর ও চট্টগ্রামে |

জানা গেছে, ঢাকা ও এর আশপাশের প্রায় ২০০ সিএনজি স্টেশনে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা পাঁচ কোটি ঘনফুট হলেও বর্তমানে অর্ধেকও পাচ্ছে না স্টেশনগুলো। সিএনজি  স্টেশন মালিকরা জানান, স্টেশনে গ্যাসের চাপ থাকার কথা ১৫ পিএসআই। অথচ সেখানে চাপ নেমে আসছে পাঁচ পিএসআইয়ের নিচে।  বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রতিবার শীতে এমনিতেই পাইপ লাইনে কনডেনসেট (গ্যাসের উপজাত) জমে। এছাড়া শীতে গ্যাস ব্যবহার হয় বেশি। ফলে এ সময় গ্যাস সরবরাহে সমস্যা হয়। কিন্তু এবারের সমস্যাটা কেবল এসব কারণে নয়। দিনের পর দিন অবৈধ সংযোগ বেড়ে যাওয়া, গ্যাসের মজুদ কমে যাওয়া ইত্যাদি কারণে এখন থেকে প্রতিবছর এ সংকট বাড়বে। ভবিষ্যতে পরিস্থিতির খুব একটা উন্নতি ঘটবে না। সেক্ষেত্রে এখনি পাইপলাইনের গ্যাসের বিকল্প লিকুইফাইড পেট্রোলিয়াম (এলপি) গ্যাস বা সিলিন্ডার গ্যাসের ব্যবহার বাড়াতে হবে। আগামী তিন-চার বছরের মধ্যে দেশের ৭০ শতাংশ মানুষকে এলপি গ্যাস ব্যবহারের আওতায় নিয়ে আসতে হবে।