ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর হাসপাতালে সেবার নামে যা হচ্ছে!


brahmanbaria shadar hospital crime

ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা সদর হাসপাতালে বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ পাওয়া গেছে। এর মধ্যে- হাসপাতালে কর্তব্যরত চিকিৎসকরা রোগীদের সঠিক চিকিৎসা না দেওয়া, নেশাগ্রস্তদের কাছ থেকে রক্ত সংগ্রহ করা, রাত ১২ টার পর কোন ডিউটি ডাক্তারকে খোজে না পাওয়া, হাসপাতালের বরাদ্ধকৃত ওষধ উধাও হয়ে যাওয়া, মেডিকেল রিপ্রেজেন্টেটিভ কতৃক রোগী ও সাংবাদিক হয়রানি ও দালালরা রোগীদের ভাগিয়ে নেওয়ার মত অভিযোগ পাওয়া গিয়েছে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, সকাল ৮ টা থেকে বিকাল ২.৩০ টা পর্যন্ত হাসপাতালের কর্তব্যরত চিকিৎসকদের ডিউটি করার কথা থাকলেও ডাক্তাররা ১০ টার পর এসে দুপুর ১ টার আগে চলে গিয়ে প্রাইভেট চেম্বারে রোগী দেখেন। গ্রাম থেকে আসা রোগীদের সঠিক চিকিৎসা দিচ্ছেন না সেখানকার ডাক্তাররা। কিন্তু তাদের প্রাইভেট চেম্বারে কোন রোগী গেলে তখন তাদেরকে খুব যত্ন করে চিকিৎসা দেওয়া হয়।
হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা শহরের হালদার পাড়ার বাসিন্দা সীমা আক্তার জানান, গত ২৫ জানুয়ারি বেলা ১২ টায় তিনি সদর হাসপাতালের ১১৫ নম্বর কক্ষে ডাক্তার মারিয়া পারভীনের কাছে যান চিকিৎসার জন্য। ডাক্তারের রুমের বাইরে প্রচুর রোগী লাইন ধরে দাড়িয়ে থাকলেও ভেতরের চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। ওই রুমের দুইজন ডাক্তারের সামনে একজনও রোগী নেই এবং ডাক্তার মারিয়া পারভীন রোগী সীমা আক্তারকে ভালোভাবে না দেখেই একটি পরীক্ষা লিখে দিয়েছেন। সীমা আক্তার বললেন, ডাক্তার মারিয়া পারভী রুমে বসে রোগী না দেখে একজন পুরুষের সঙ্গে কথা বলছিলেন। তাছাড়া ওই ডাক্তার সীমার সঙ্গে ভালো ব্যবহারও করেননি।
এ বিষয়ে ডাক্তার মারিয়া পরভীন বলেন, আমি আমার চেম্বারে কি করব না করব এটা কারও দেখার বিষয় নয়। এটি সম্পূর্ণ আমার ব্যক্তিগত ব্যপার। ডিউটি সময়ে আপনি যা ইচ্ছা তা করতে পারেন কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আমি বিশ্রাম নিতেই পাড়ি। এত রোগী দেখা কঠিন কাজ।
এ দিকে হাসপাতলের জরুরি বিভাগের ডিউটি ডাক্তারের সঙ্গে মেডিকেল রিপ্রেজেন্টেটিভদের সরাসরি সাক্ষাতের কোন বিধান না থাকলেও বেশিরভাগ সময়ই ডিউটি ডাক্তারকে মেডিকেল রিপ্রেজেন্টেটিভরা ঘিরে রাখে। এতে করে একদিকে যেমন ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে রোগীরা অন্যদিকে পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে বাধাগ্রস্ত হচ্ছেন গণমাধ্যম কর্মীরা।
এ দিকে অভিযোগ রয়েছে সদর হাসপাতালে রক্ত সংগ্রহের কাজ চলে নেশায় আসক্তদের কাছ থেকে। হাসপাতালের দ্বিতীয় গেইটে (বর্হিবিভাগ) ১০/১৫ জন নেশায় আশক্ত লোক সব সময় শোয়ে-বসে নেশা করে সময় কাটায়। যখনই হাসপাতালের কোন রোগীর রক্তের প্রয়োজন হয় তখনই তাদের ডাক পরে। আর এই ডাকের কাজটি করে হাসপাতালের গেইটের পিঠা বিক্রেতা দালাল মান্নান। রক্তদাতারা প্রতি ব্যাগ রক্ত বিক্রি করে ৪০০ টাকায়। কিন্তু রোগীর আত্বীয়দের এই রক্ত কিনতে হয় ২০০০ টাকায়। এই রক্ত বেচা-কেনার মধ্যে চলে দালালি। এই রক্ত দুই তিন হাত বদল হয়ে রোগীর হাতে যায় বলে এর দাম বেড়ে যায়। তবে তাদের রক্ত দেওয়ার ক্ষেত্রে সবচেয়ে আতঙ্কের বিষয় হল, একজন রক্তদাতা মাসে ২০ থেকে ২৮ বার রক্ত দিয়ে থাকেন। এমনটিই জানালেন, রক্তদাতা সেলিম (৪০) মিলন (৩৫) কামাল (৩০) মান্নান (৫০) রনি (২৭)।
তবে ময়মনসিংহের হিরা মিয়ার পুত্র রনি (২৭) বলেন, আমি রক্ত দিতে দিতে রোগা হয়ে গেছি, তাই জেলখানায় যাওয়ার ব্যবস্থা করেছি। সেখানে গেলে শরীরটা কিছু ভালো হবে। পরে জেলখানা থেকে বের হয়ে আবার এই কাজ ভালোভাবে করা যাবে।
এ বিষয়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর হাসপাতালের পরিচালক ডাঃ সৈকত আলি বলেন, একজন স্বাভাবিক মানুষ প্রতি ৪ মাস পর পর রক্ত দিতে পারে। কিন্তু সেই জায়গায় যদি মাসে ২০/২৮ বার কোন মানুষ রক্ত দেয় তাহলে এটা রক্ত নয়, এটা শুধু লাল পানি। তিনি আরও জানান, নেশা আসক্ত ব্যাক্তিদের রক্ত সুস্থ মানুষের শরীরে গেলে মারাত্নক ক্ষতি হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। এইচ আই ভি এইডস ও নিপোলিসের মতো প্রাণঘাতি রোগ হতে পারে।
এ দিকে শহরের মৌড়াইল এলাকার মইনুল ইসলাম বলেন, কিছুদিন আগে আমার এক আত্মীয় সদর হাসপাতালে ভর্তি ছিল। রাত ১২ টার সময় রোগীর এক সমস্যা দেখা দিলে তখন শত চেষ্টা করেও কর্তব্যরত কোন চিকিৎসক পাওয়া যায়নি। শুধু তাই নয়, রাত ১২ টার পর নার্সদেরও পাওয়া কষ্টকর। নার্সরা অপারেশন থিয়েটারে ঘুমিয়ে থাকেন।
সদর হাসপাতালে বরাদ্ধকৃত ঔষধের সিংহভাগ পাচার হয়ে যাচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। রোগীদের অভিযোগ, হাসপাতালে আসা রোগীরা সরকারি ওষধের মধ্যে প্যারাসিটামল, নাপা ও এই জাতীয় সাধারণ কিছু ঔষধ ছাড়া কিছুই পাচ্ছেন না।
হাসপাতালে দালালরা রোগীদের ভাগীয়ে নেওয়ার অভিযোগ নতুন নয়। দূর-দূরান্তের গ্রাম থেকে আসা সহজ-সরল রোগীদের আত্মীয়দের ফুসলিয়ে দালালরা তাদের নিয়ে যাচ্ছে প্রাইভেট ক্লিনিকে। কমিশনের লোভে হাসপাতলের অনেক কর্মকর্তা-কর্মচারীরাও এই কাজে জড়িত বলে অভিযোগ আছে। এই দালাল নির্মূলে কতৃপক্ষের কোন ব্যবস্থা নেয়নি। ‘দালাল থেকে সাবধান’ হাসপাতালে এই জাতীয় লেখার কয়েকটি সাইনবোর্ড সাটিয়ে কতৃপক্ষ দায়িত্ব শেষ করেছেন।
এ বিষয়ে বুধবার ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা সদর হাসপাতালের পরিচালক ডাঃ সৈকত আলি এই প্রতিবেদককে বলেন, আমি এখানে নতুন এসেছি। এইসব অভিযোগগুলো আমি আমলে নিলাম। যত দ্রুত সম্ভব আমি এই হাসপতালকে অনিয়ম ও দুর্নীতিমুক্ত করার চেষ্টা করব।