যেভাবে করোনা নিয়ন্ত্রণে রেখেছে জাপান


 

গত ডিসেম্বরে চীনে প্রথম করোনার প্রকোপ ধরা পড়ে। এরপর থেকেই বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে প্রাণঘাতী এই ভাইরাস। এদিকে, গত ফেব্রুয়ারিতে জাপানে পৌঁছায় বিলাসবহুল প্রমোদতরী ডায়মন্ড প্রিন্সেস। ওই প্রমোদতরীতে ততদিনে করোনার প্রকোপ শুরু হয়ে গেছে।

কার্নিভাল করপোরেশনের বিলাসবহুল ওই প্রমোদতরীতে প্রায় ৩ হাজার ৭০০ যাত্রী ছিলেন। প্রমোদতরীটি রাজধানী টোকিওর ইয়োকোহামা বন্দরে নোঙ্গর করে। জাহাজের এক যাত্রীর শরীরে করোনাভাইরাসের লক্ষণ পাওয়ার পর গত ৩ ফেব্রুয়ারি থেকে ওই বন্দরে কোয়ারেন্টাইনে ছিল প্রিন্সেস ডায়মন্ড।

প্রায় দুই সপ্তাহের বেশি সময় ধরে ওই বন্দরেই অবস্থান করার পর অবশেষে ১৯ ফেব্রুয়ারি কর্তৃপক্ষ জানায় যে, করোনায় বিপর্যস্ত প্রিন্সেস ডায়মন্ড থেকে যাত্রীরা ফিরে যাচ্ছেন। বিভিন্ন দেশ ওই জাহাজে থাকা তাদের নাগরিকদের সরিয়ে নেয়। এতদিন বন্দরে আটকে থাকায় অনেকেই হতাশ হয়ে পড়েছিলেন। করোনার প্রাদুর্ভাব যেন ছড়িয়ে পড়তে না পারে সেজন্য কর্তৃপক্ষও শুরুতেই জাহাজের যাত্রীদের সেখান থেকে সরিয়ে নিতে পারেনি। কিছুদিন তাদের অপেক্ষা করতে হয়েছে।

ওই প্রমোদতরীর কারণে করোনা প্রাদুর্ভাবের হুমকির মুখে পড়ে গিয়েছিল পুরো জাপান। কিন্তু কর্তৃপক্ষ সে সময় শক্ত হাতে পুরো পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম হয়েছে। প্রথমদিকের বিভিন্ন পদক্ষেপের কারণে জাপানের অর্থনীতি মুখ থুবড়ে পড়ার বদলে অনেক দেশের তুলনায় বেশ স্থিতিশীল রয়েছে।

সাম্প্রতিক সময়ে দৈনিক সংক্রমণ বাড়তে থাকলেও জাপানের অর্থনীতি অনেকটাই ঘুরে দাঁড়িয়েছে। জাপানে এখন পর্যন্ত করোনায় আক্রান্ত হয়ে মারা গেছে ২ হাজার ৪৮৭ জন। চীনের চেয়ে এই সংখ্যা অর্ধেক এবং গত কয়েক সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্রের দৈনিক মৃত্যুর চেয়েও কম। জাপানে প্রতি ১০ লাখে মাত্র ১৮ জনের মৃত্যু হয়েছে।

চীনের তুলনায় এই সংখ্যা কিছুটা বেশি। তবে জি৭ আওতাভূক্ত দেশগুলোর চেয়ে অনেক কম। জাপান কঠোর লকডাউন বা গণহারে টেস্টিং করা ছাড়াই করোনা পরিস্থিতিতে বেশ সফল হয়েছে। যা অনেক দেশ কঠোর বিধি-নিষেধ জারি করেও অর্জন করতে পারেনি।

জাপানের ভাইরোলজিস্ট ওশিতানি হিতোশি বলেন, শুরুতেই আমরা করোনা নিয়ন্ত্রণের কোনো লক্ষ্য নেইনি। তবে করোনা যেন ছড়িয়ে পড়তে না পারে সেদিকে গুরুত্ব দিয়েছে জাপান। তিনি বলেন, আপনি যদি সপ্তাহে একদিনও সবাইকে টেস্ট করেন তারপরও কিছু মানুষ হিসাবের বাইরে থেকে যাবে।

তিনি বলেন, জি৭ আওতাভূক্ত দেশগুলোর মধ্যে জাপানই সবচেয়ে কম পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালিয়েছে। জাপান গণহারে পরীক্ষার বদলে ডায়মন্ড প্রিন্সেসের ঘটনা থেকে পাওয়া শিক্ষাকে কাজে লাগানোর চেষ্টা করেছে।

ভাইরাসের বিষয়ে সব ধরনের প্রটোকল মেনে চলার পরেও ডায়মন্ড প্রিন্সেসের প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত কর্মকর্তা এবং নার্সরা করোনায় আক্রান্ত হন। সে সময় গবেষণার পর ওশিতানির টিম জানায় যে, ড্রপলেট থেকে করোনা ছড়িয়ে পড়ে। তারা জানান, এই ভাইরাস বাতাসের মাধ্যমেও ছড়িয়ে পড়ছে।

মার্চের প্রথম দিকে জাপানের কর্মকর্তারা দেশটির নাগরিকদের তিনটি বিষয়ে সতর্ক করতে শুরু করে দেন। আবদ্ধ স্থান, জনবহুল এলাকা এবং লোকজনের সংস্পর্শ এড়িয়ে চলতে বলা হয়। সামাজিক মাধ্যমে এই বিষয়গুলো ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। বসন্তে একটি জরিপ চালানো হয়েছিল। সেখানে দেখা গেছে, জাপানের অধিকাংশ মানুষই এই তিনটি জিনিস এড়িয়ে চলেছেন।

জাপানে এই তিনটি বিষয়কে একত্রে বলা হয় সান মিতসু বা ৩সিএস। দেশটির জিউকোকুমিনশাহ প্রকাশনা সম্প্রতি এক ঘোষণায় জানিয়েছে, এই শব্দটি ২০২০ সালে জাপানে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয়েছে।

দেশজুড়ে কঠোর লকডাউন না দিলেও মাস্ক ব্যবহার এবং জনসমাগম এড়িয়ে চলার বিষয়টি নিশ্চিত করতে পেরেছে কর্তৃপক্ষ। ফলে পশ্চিমা অনেক দেশেই যখন সিনেমা হল খোলার সাহস পায়নি তখন জাপানের মুভি থিয়েটারগুলো ছিল প্রায় পুরোপুরি নিরাপদ। ৩সিএস ছাড়াও জাপান সরকার দেশের নাগরিকদের আরও পাঁচটি বিষয়ে সতর্ক করেছে।

নৈশভোজের পার্টি, চারজনের বেশি মানুষ একত্র হয়ে খাওয়া-দাওয়া, কাছাকাছি থাকা অবস্থায় মাস্ক পরিধান না করা, ডরমিটরিতে বা ছোট স্থানে বেশি মানুষের একত্রে বসবাস, ট্রায়াল রুম ব্যবহার ইত্যাদি সম্পর্কে জনগণকে প্রতিনিয়ত সচেতন করা হয়েছে। যদি সাধারণ লোকজন সরকারের এসব নির্দেশনা না মেনে চলত তাহলে পরিস্থিতি হয়তো ভিন্ন হতে পারত।

কিন্তু জাপানিরা সরকারের পরামর্শ মেনেই চলেছে। শুধু তাই নয়, কারও দেহে করোনার কোনো লক্ষণ দেখা দিলেই তারা নিজ উদ্যোগে বাড়িতে অবস্থান করেছে এবং কোয়ারেন্টাইনে থেকেছে। ওশিতানি বলেন, একই সমাজব্যবস্থা মেনে চলায় আমাদের নিয়ে বেশ সমালোচনাও হয়। কিন্তু আমার মনে হয় এটা এই করোনা মহামারি পরিস্থিতে বেশ ইতিবাচকও। তাছাড়া স্বাস্থ্যবিধির বিষয়ে জাপান অনেক দেশের তুলনায় আগে থেকেই অনেক বেশি সচেতন।

যুক্তরাষ্ট্রের মতো দেশে যেখানে লোকজন মাস্ক পরা এবং লকডাউন বিরোধী বিক্ষোভ করেছে সেখানে জাপানের লোকজন মাস্ক পরাকেই স্বাভাবিক ঘটনা হিসেবে গ্রহণ করেছে। এই শরতে ফ্লুর মৌসুমে জাপানে স্বাভাবিক ইনফ্লুয়েঞ্জায় মাত্র ১৪৮ জন আক্রান্ত হয়েছে। গত পাঁচ বছরে গড়ে এই একই সময়ে এই সংখ্যা ছিল এক শতাংশেরও কম।

করোনায় সবচেয়ে ঝুঁকিতে রয়েছে বয়স্ক লোকজন। জাপানে মোট জনসংখ্যার প্রায় ২৯ ভাগই বয়স্ক। কিন্তু তারা অন্যান্য দেশের বয়স্ক লোকের তুলনায় সুস্বাস্থ্যের অধিকারী। জাপানে মাত্র ৪.২ ভাগ বয়স্ক মানুষ স্থূলকায়। বয়স্ক, স্থূলকায় লোকজনের ক্ষেত্রে করোনা আরও বেশি প্রাণঘাতী হয়ে উঠতে পারে সেটা প্রায় সবাই জানে। জাপানের স্বাস্থ্য বিধিও অন্যান্য দেশের তুলনায় বেশ উন্নত। এর সুফলও পাচ্ছে তারা।