বন্ধু জ্যাকবের মৃত্যুতে শোকাভিভূত বাংলাদেশ


general jacob

বাংলাদেশ ১৯৭১ সালে পাকিস্তানী সৈন্যদের আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য করার ক্ষেত্রে প্রধান ভূমিকা পালনকারী ভারতীয় জেনারেলের মৃত্যুতে শোকাভিভূত। বাংলাদেশের স্বাধীনতা লাভের মুহূর্তে ঐতিহাসিক দায়িত্ব সম্পন্ন করার ৪৪ বছর পর তিনি বুধবার ৯২ বছরে বয়সে পরলোকগমন করেছেন। রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভারতের সাবেক লে. জেনারেল জ্যাকবের মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করেছেন। বাংলাদেশ তাকে মুক্তিযুদ্ধের বন্ধু সম্মাননা প্রদান করেছে। রাষ্ট্রপতি তাঁর শোক বার্তায় জেনারেল জ্যাকবকে ‘আমাদের মহান স্বাধীনতা যুদ্ধের একজন বীর সৈনিক হিসেবে’ উল্লেখ করে বলেছেন, বাংলাদেশ তার মৃত্যুতে একজন প্রকৃত বন্ধুকে হারিয়েছে। প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, জাতি আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধে তার অবদানের জন্য গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে তাকে চিরদিন স্মরণ করবে। সংসদের স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী, মন্ত্রীবর্গ এবং বেশ কিছু সামাজিক ও রাজনৈতিক ফোরাম নয় মাসব্যাপী যুদ্ধের পুরো সময়ে জুড়ে ভারতীয় জেনারেলের ভূমিকার কথা স্মরণ করে তার প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানান। আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর জ্যাকবের ভূমিকাকে যুদ্ধ কৌশলবিদ ও ইতিহাসবিদরা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে অভিহিত করেছেন। তিনি ঢাকায় অবতরণ করার পরপরই তৎকালীন পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর কমান্ডার লে. জেনারেল এ এ কে নিয়াজিকে আত্মসমর্পণ করতে রাজী করিয়েছিলেন। পরবর্তী ঘটনা প্রবাহ প্রমাণ করে যে,বৈশ্বিক রাজনৈতিক ও সামরিক প্রেক্ষাপটে নাটকীয় ও স্পর্শকাতর কর্মকান্ডের মধ্যে সেদিন পাকিস্তানী সৈন্যদের আত্মসমর্পণ ছিল খুবই তাৎপর্যপূর্ণ। পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে জ্যাকবকে সেদিন সম্ভাব্য স্বল্পতম সময়ে আত্মসমর্পণের দলিল স্বাক্ষর করার বিষয়ে শত্রু কমান্ডারকে রাজী করানোর সবচেয়ে কঠিন কাজটি করতে হয়েছিল। চার বছর আগে এক সাক্ষাৎকারে জ্যাকব বলেছিলেন, যুদ্ধ আরো দীর্ঘায়িত হলে বাংলাদেশের স্বাধীনতা লাভ অনিশ্চিত হতো। তিনি তখন ভারতের পূর্বাঞ্চলীয় কমান্ডের প্রধান ছিলেন। বাংলাদেশের স্বাধীনতা লাভের ৪০তম বার্ষিকী উদযাপন উপলক্ষে ১৯৭১ সালের বিশিষ্ট বিদেশী বন্ধুদের জন্য দেয়া সম্মাননা গ্রহণ করার জন্য ঢাকায় সফর করে তিনি আরো বলেছিলেন, যুদ্ধ আর একটি দিনের জন্যও অব্যাহত থাকলে ভারতকে ফিরে যেতে হতো। তিনি আরো বলেছিলেন যে, অবিলম্বে অস্ত্র বিরতির জন্য সকল পক্ষ থেকে আহ্বান জানানোর প্রেক্ষিতে জাতিসংঘ প্রস্তাব গ্রহণের বিষয়টি এড়ানোর জন্য অবিলম্ব বিজয় নিশ্চিত করার জন্য ভারতীয় সেনা বাহিনীর ওপর ব্যাপক চাপ সৃষ্টি করা হয়েছিল। অর্থাৎ ভারতীয় সেনা বাহিনীর প্রত্যাহার এবং যুদ্ধ ক্ষেত্রে অচলাবস্থা সৃষ্টি হলে বাংলাদেশের স্বাধীনতা লাভের ঘটনাটি অনিশ্চিত হয়ে পড়তো। জ্যাকব বলেছেন, জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে অধিবেশন চলছিল। সোভিয়েত ইউনিয়ন ভারতকে জানিয়েছে তারা জাতিসংঘে আর কোন অস্ত্র বিরতির প্রস্তাব ঠেকাতে ভেটো দিবে না। এর আগে তারা ভেটো দিয়েছিল। জ্যাকব উল্লেখ করেন, তিনি তখন ঢাকায় চলে আসেন এবং ১৯৭১ সাল ১৬ ডিসেম্বর পাকিস্তানের সামরিক কমান্ডারকে নিঃশর্তভাবে আত্মসমর্পণ করানোর জন্য চেষ্টা করে সফল হন। তিনি তখন নিয়াজিকে বলেছিলেন যে ‘জেনারেল আমি আপনাকে আশ্বাস দিচ্ছি আপনি শর্ত মেনে প্রকাশ্যে আত্মসমর্পণ করলে আমরা আপনার এবং আপনার লোকদের দায়িত্ব নেবো। আপনি আত্মসমর্পণ করতে না পারলে আমরা কোন দায়িত্ব নিতে পারবো না।’ জ্যাকব বলেছিলেন, তিনি উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন যে, ভারতীয় সামরিক অভিযান দ্রুত সম্পন্ন করতে হবে। তখন যে কোন ধরনের বিলম্ব হলে নিয়াজি বিভিন্ন শহরে সুরক্ষা জোরদার এবং আগের কৌশল পরিবর্তন করে নিজেদের প্রতিরক্ষা জোরদার করার সুযোগ পেতো। জ্যাকব বলেছিলেন, ‘ঐ মুহূর্তে যে কোন মূল্যে আত্মসমর্পণ নিশ্চিত করাই ছিল আমাদের কাজ।’ জ্যাকব বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধে বাঙ্গালী মুক্তিযুদ্ধাদের ভূমিকা মূল্যায়ন প্রসঙ্গে মুক্তিযোদ্ধাদের ভূয়সী প্রশংসা করে বলেন সব কৃতিত্ব বাংলাদেশের জনগণের। তিনি বলেছিলেন, জনগণই জেগে ওঠেছিল তারা মুক্তি ফৌজ গঠন করেছিল, যুদ্ধের চূড়ান্ত পর্যায় সাহায্য করার জন্য ভারতীয় সেনাবাহিনী এসেছিল। তিনি আরো বলেছেন, আমি আরেকটি বিষয় উল্লেখ করতে চাই যে, পাকিস্তানী সেনাবাহিনী ছিল খুবই প্রশিক্ষিত ও সুসজ্জিত। তাদরে পরাজিত করার কঠিন ছিল। মুক্তি ফৌজ তাদের ওপর হামলা চালিয়ে ভীতির পরিবেশ সৃষ্টি করেছিল যাতে তারা চলাচল করতে না পারে। এই পরিস্থিতিতে পাকিস্তানের পরাজয় ঘটেছিল। বৃটিশ ভারতের অধীন বেঙ্গল প্রেসিডেন্সীতে জন্মগ্রহণকারী জ্যাকব ১৯ বছর বয়সে সেনাবাহিনীতে যোগ দেন। তিনি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে এবং ১৯৬৫ সালে ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধে লড়াই করেছেন। তিনি ১৯৭৮ সালে অবসর গ্রহণ করেন। পরে তিনি গোয়া ও পাঞ্জাব রাজ্যের গভর্নর হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।