বাবরি মসজিদ মামলার রায়ে মমতা কেন নীরব?


ভারতের বহুল আলোচিত বাবরি মসজিদ মামলার রায়ের পর বিভিন্ন ব্যক্তিত্ব মন্তব্য করলেও নীরব পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনি বা তৃণমূলের কোনো নেতা এ নিয়ে মুখ খোলেননি। বরং তাৎপর্যপূর্ণভাবে সোশ্যাল মিডিয়ায় নিজের কবিতা পোস্ট করেছেন তৃণমূল নেত্রী।

অযোধ্যা মামলার রায় বেরোনোর পর ব্যাপক প্রতিক্রিয়া হবে, এমনটাই প্রত্যাশিত ছিল। সেই অনুযায়ী প্রতিক্রিয়াও মিলেছে বিভিন্ন স্তরের মানুষে থেকে। তবে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নীরবতা অনেককেই বিস্মিত করেছে। কেন তিনি অযোধ্যা রায় নিয়ে মুখ খুললেন না? এই প্রশ্নে দুটি ভিন্ন মত উঠে আসছে।

এক পক্ষের মত, শুধুই নির্বাচনী অঙ্কের কথা মাথায় রেখে মুখ্যমন্ত্রী নীরব থেকেছেন। আরেক পক্ষের বক্তব্য, সম্প্রীতি অক্ষুণ্ণ রাখার চেষ্টা। লোকসভা নির্বাচনে পশ্চিমবঙ্গে বিস্ময়কর উত্থান হয়েছে বিজেপির। ১৮টি আসনে জয়ী হয়েছে তারা। হিন্দু জাতীয়তাবাদী দলটি বারবার তৃণমূলের বিরুদ্ধে সংখ্যালঘু তোষণের অভিযোগ এনেছে।

ভোটের এই ফল বিশ্লেষণ করে অধ্যাপক বিমলশঙ্কর নন্দ বলেন, ‘গত নির্বাচনে হিন্দুদের একাংশের ভোট বিজেপির দিকে চলে গেছে। তৃণমূলের সংখ্যালঘু তোষণের জন্যই এই ভোট বিপক্ষে গেছে বলে মনে করা হচ্ছে। তাই অযোধ্যা রায় নিয়ে সরাসরি মন্তব্য করা মুখ্যমন্ত্রীর পক্ষে কঠিন।’

পশ্চিমবঙ্গে সংখ্যালঘু ভোট এক চতুর্থাংশের বেশি। তাদের ভোট মূলত তৃণমূলের পক্ষেই যায়। অধ্যাপক নন্দের মতে, মুখ্যমন্ত্রী অযোধ্যা রায়কে স্বাগত জানালে সংখ্যালঘুরা বিরক্ত হতোই। আবার উষ্মা প্রকাশ করলে এই রায় ঘিরে হিন্দুদের মধ্যে যে উন্মাদনা তৈরি হয়েছে, তাতে বিরূপ প্রতিক্রিয়া হতো। তাই মুখ্যমন্ত্রী নীরব থাকাই শ্রেয় মনে করেছেন।

এই সুযোগে বিজেপির রাজ্য সভাপতি দিলীপ ঘোষ কটাক্ষ করেছেন মমতাকে। তার বক্তব্য, কোনো ভালো জিনিস তৃণমূল দেখতে পারে না। ৩৭০ ধারা বিলোপ কিংবা সার্জিক্যাল স্ট্রাইক যাই হোক না কেন, তৃণমূলের তোষণের রাজনীতি করার প্রয়োজন রয়েছে।

যদিও মমতা পুরোপুরি নীরব থেকেছেন, এটাও ঠিক নয়। তিনি সোশ্যাল মিডিয়ায় একটি কবিতা পোস্ট করেছেন রায় বেরোনোর পর। যার একাধিক লাইন বেশ তাৎপর্যপূর্ণ। মুখ্যমন্ত্রী লিখেছেন, ‘অনেক সময় কথা না বলেও অনেক কথা বলা হয়ে যায়। কিছু বলার থেকে না বলাটা আরও শক্তিশালী বলা।’

এই কবিতায় অযোধ্যা বা রাম মন্দিরের উল্লেখ না থাকলেও, এখানে যে সেই ইস্যুতেই বার্তা দেয়া হয়েছে, তা নিয়ে অনেকেই নিশ্চিত। রাজনৈতিক বিশ্লেষক শিবাজীপ্রতিম বসু বলেন, ‘নীরবতার মধ্যেই একটা প্রচ্ছন্ন বার্তা আছে যে তিনি রায়কে স্বাগত জানাচ্ছেন না। আবার সমালোচনা থেকেও বিরত থাকছেন। ভোটের অঙ্ক তো তাকে মাথায় রাখতেই হয়। তবে এই কবিতার প্রেক্ষাপটে সাম্প্রতিক অতীতে জয় শ্রী রাম স্লোগানের বিরুদ্ধে মুখ্যমন্ত্রীর যে তীব্র প্রতিক্রিয়া আমরা দেখেছি তা থেকে তার অবস্থান আঁচ করা যায়। একইসঙ্গে সম্প্রীতি বজায় রাখার স্বার্থে তিনি সরাসরি মন্তব্য এড়িয়েছেন।’

লোকসভা নির্বাচনের আগে থেকেই পশ্চিমবঙ্গে হিন্দু জাতীয়তাবাদীদের প্রভাব বৃদ্ধির লক্ষণ দেখা যাচ্ছে।রাম নবমী, হনুমান জয়ন্তী পালন করা হচ্ছে ঘটা করে। কলকাতা শহরের গুরুত্বপূর্ণ স্থানে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে একাধিক অতিকায় হনুমান মূর্তি। এছাড়া রয়েছে রাম ও হনুমানের মন্দির। এর সঙ্গে অযোধ্যা নিয়ে মমতার নীরবতা নির্বাচনে আরো কতটা প্রভাব ফেলবে, তা নিয়ে ভিন্নমত দুই বিশ্লে্ষকের।

অধ্যাপক নন্দের মতে, ‘ধর্ম নিয়ে রাজনীতি দুই দিকের ধারবিশিষ্ট তলোয়ারের মত। আপনি যেদিকেই যান, ক্ষতি হবে পারে। যে সংখ্যালঘুরা ভেবেছিল, মমতা এই রায়ের সমালোচনা করবেন, তারা অখুশি হবে। সেই ভোটের একাংশ বাম বা কংগ্রেসের দিকে চলে গেলে তৃণমূলের ক্ষতি।’

কিন্তু অধ্যাপক বসুর বক্তব্য, ‘পশ্চিমবঙ্গে ভোটের বিভাজন হয়ে গিয়েছে। তিনি রায়ের সমালোচনা করলে মুসলিমদের নিশ্চয়ই ভালো লাগত। কিন্তু তার রাজনৈতিক বাধ্যবাধকতার কথা সংখ্যালঘুরা জানে। তাই তাদের ভোট তৃণমূল থেকে চলে যাওয়ার সম্ভাবনা নেই।