তিনদিনেই টাইগারদের খাঁচাবন্দি করে ফেললো আফগানরা


হারটা কি তবে এখন সময়ের ব্যাপার মাত্র! আফগানদের বিপক্ষে টেস্টের তৃতীয় দিনেই ৩৭৪ রানের বিশাল ব্যবধানে পিছিয়ে পড়লো বাংলাদেশ। বাকি ২ দিনে যে কি হবে টাইগারদের। অলৌকিক কিছু না হলে এখন চট্টগ্রাম টেস্ট বাঁচানোই পুরোপুরি অসম্ভব হয়ে পড়েছে সাকিব আল হাসানের দলের সামনে।

তৃতীয় দিনের খেলা শেষ হয়েছে ২০ মিনিট আগে। আলোকস্বল্পতার কারণে ২০ মিনিট আগে খেলা শেষ করতে হয় আম্পায়ারদের। তাতেই দ্বিতীয় ইনিংসের আফগানদের সংগ্রহ দাঁড়িয়েছে ৮ উইকেট হারিয়ে ২৩৭ রান। প্রথম ইনিংসে তারা এগিয়ে ১৩৭ রানে। সব মিলিয়ে বাংলাদেশের চেয়ে এখন ৩৭৪ রানে এগিয়ে সফরকারী আফগানরা।

বাকি ২ উইকেটে আর কত রান যোগ করে রশিদ খানের দল, সেটাই এখন দেখার বিষয়। প্রায় ৪০০ রানের একটা লক্ষ্য যদি বাংলাদেশের সামনে ছুঁড়ে দিতে পারে আফগানরা, তাহলে সেই রান পাড়ি দিয়ে টাইগারদের ম্যাচ জয় হবে প্রায় অসম্ভব।

কারণ, আফগান স্পিনারদের ঘূর্ণির সামনে প্রথম ইনিংসে মাত্র ২০৫ রানে অলআউট হয়েছিল বাংলাদেশ। অন্যদিকে, চতুর্থ ইনিংসে চট্টগ্রামের উইকেট পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে থাকবে রশিদ খানদের দখলে।

ওই অবস্থায় চতুর্থ ইনিংসে এত বড় একটি স্কোর তাড়া করে জেতা তো দুরে থাক, ড্র করাও সম্ভব হবে না টাইগারদের। সুতরাং, অলৌকিক কিছু না হলে এখন পরাজয়ই বলতে গেলে অবধারিত। অথচ, এ নিয়ে মাত্র তৃতীয় টেস্ট খেলছে আফগানিস্তান।

এখনও আফগানদের ভরসা হয়ে ক্রিজে দাঁড়িয়ে রয়েছেন আফসার জাজাই। ৬ নম্বরে ব্যাট করতে নেমে তিনি এখনও অপরাজিত ৩৪ রানে। তার সঙ্গে উইকেটে রয়েছেন ইয়ামিন আহমদজাই। দ্বিতীয় ইনিংসে বাংলাদেশের হয়ে ৩টি উইকেট নিয়েছেন সাকিব আল হাসান। ২টি করে উইকেট নিয়েছেন তাইজুল ইসলাম এবং নাঈম হাসান। ১টি নিয়েছেন মেহেদী হাসান মিরাজ।

আফগানদের দ্বিতীয় ইনিংসের শুরুতে আশা জাগিয়েছিলেন সাকিব আল হাসান। টানা দুই বলে দুই উইকেট তুলে নিয়ে রশিদ খানদের কোণঠাসা করে দিয়েছিলেন বাংলাদেশ দলপতি। তবে ৪ রানে ২ উইকেট হারানো আফগানরা এরপর ভালোভাবেই লড়াইয়ে ফিরে আসে। ক্রিকেটের নবীশ এই দলটি টাইগারদের শিখিয়ে যাচ্ছে কিভাবে ধৈর্য্য দেখিয়ে টেস্ট খেলতে হয়।

প্রথম ইনিংসে আফগানদের করা ৩৪২ রানের জবাবে ৭০.৫ ওভার ব্যাট করে বাংলাদেশ অলআউট হয় ২০৫ রানে। ফলে ১৩৭ রানে এগিয়ে থেকে দ্বিতীয় ইনিংসে ব্যাট করতে নামে রশিদ খানের দল। ইনিংসের প্রথম ওভারেই বল হাতে নেন অধিনায়ক সাকিব আল হাসান আর নিজের তৃতীয় ডেলিভারিতে ওপেনার ইহসানউল্লাহ জানাতকে (৪) এলবিডব্লিউয়ের ফাঁদে ফেলে সাজঘরের পথ দেখান।

ঠিক পরের বলে আরও এক উইকেট। এবার সাকিবকে দুই পা এগিয়ে খেলতে গিয়ে তার হাতেই ফিরতি ক্যাচ দেন প্রথম ইনিংসের সেঞ্চুরিয়ান রহমত শাহ (০)।

তৃতীয় উইকেটে কিছুটা প্রতিরোধ গড়ে আফগানিস্তান। ১৪ ওভারের জুটিতে ২৪ রান যোগ করেন ইব্রাহিম জাদরান আর হাসমতউল্লাহ শহীদি। শেষতক এই জুটিটি ভেঙে দেন নাইম হাসান। তার ঘূর্ণিতে ডিফেন্স করতে গিয়ে প্রথম স্লিপে সৌম্য সরকারকে ক্যাচ দেন শহীদি (১২)।

সেখান থেকে ১০৮ রানের জুটি ইব্রাহিম জাদরান আর আসগর আফগানের। কাটায় কাটায় ফিফটি করে আসগর ফেরেন তাইজুল ইসলামের শিকার হয়ে। অভিষিক্ত ইবরাহিম জাদরান ছিলেন বাংলাদেশের বোলারদের জন্য বড় মাথা ব্যথার কারণ। একপ্রান্তে নিয়মিত বিরতিতে উইকেট পড়লেও ইবরাহিম আরেকপ্রান্ত ধরে রেখে দলকে এগিয়ে নিতে থাকেন।

অবশেষে দলীয় ১৭১ রানের মাথায় নাঈম হাসানের বলে লং অনে তুলে মারতে গিয়ে মুমিনুল হকের হাতে ধরা পড়েন মাত্র ১৭ বছর বয়সী এই ব্যাটসম্যান। ২০৮ বল খেলে ৮৭ রান করেন তিনি। ইনিংস সাজানো ছিল ৬টি বাউন্ডারি আর ৪টি ছক্কায়।

এর একটু পরই মোহাম্মদ নবীকে ফিরিয়ে দেন মেহেদী হাসান মিরাজ। ১৩ বল খেলে ৮ রান করে মোহাম্মদ নবি স্কোয়ার লেগে ক্যাচ দেন মুমিনুল হকের হাতেই। এরই মধ্য দিয়ে টেস্ট ক্রিকেটে শেষ বারের মত ব্যাটিং করে মাঠ ছাড়লেন মোহাম্মদ নবি। কারণ, চলতি টেস্ট চলাকালেই তিনি ক্রিকেটের এই ফরম্যাট থেকে অবসরের ঘোষণা দেন।

প্রথম ইনিংসে শেষ মুহূর্তে মাঠে নেমে হাফ সেঞ্চুরি করেছিলেন রশিদ খান। এবারও তিনি ভালো ব্যাটিং করলেন। ২২ বলে ২৪ রান করে শেষ পর্যন্ত উইকেট দিতে বাধ্য হন তাইজুল ইসলামকে। বোল্ড হয়ে ফিরে যান তিনি। কায়েস আহমেদ ২৬ বলে ১৪ রান করে ফিরে যান সাকিবের বলে এলবি হয়ে। রিভিউ নিয়েও বাঁচতে পারলেন না কায়েস। এর একটু পরই দিনের খেলা শেষ হয়ে যায়।

এর আগে দিনের শুরুতে ৮ উইকেটে ১৯৪ রান নিয়ে ব্যাট করতে নামে বাংলাদেশ। তৃতীয় দিনের প্রথম ওভারটা শুরু করেন আফগানিস্তানের অফ স্পিনার মোহাম্মদ নবি। আর তৃতীয় ডেলিভারিতেই তিনি ফিরিয়ে দেন তাইজুলকে। ৫৮ বল মোকাবেলায় ১৪ রান করে কাটা পড়েন পরিষ্কার বোল্ড আউটে।

এর দুই ওভার পর রশিদ খানের দারুণ এক ডেলিভারি বুঝতে না পেরে বসে প্যাড দিয়ে ঠেকিয়ে দেন নাইম হাসান। আম্পায়ারও আঙুল তুলতে দেরি করেননি। রিভিউ নিলেও তাতে কাজ হয়নি।

১২ বলে ৭ রানে আউট হন নাঈম। অপরপ্রান্তে থাকা মোসাদ্দেক হাফসেঞ্চুরির আশায় দাঁড়িয়ে ছিলেন। কিন্তু ৮২ বলে ১ বাউন্ডারি আর ২ ছক্কায় গড়া তার ৪৮ রানের ধৈর্য্যশীল ইনিংসটি থেমেছে সঙ্গীর অভাবে।

ম্যাচের দ্বিতীয় দিন বাংলাদেশ ইনিংস ওপেন করতে নেমে রানের খাতা খোলার আগেই বিদায় নেন সাদমান ইসলাম। মূলতঃ একজন পেসারও না রেখে পুরোপুরি স্পিনার দিয়ে বোলিং অ্যাটাক সাজিয়েছিল বাংলাদেশ। বিপরীতে আফগানিস্তান দলে নেয়া হয়েছিল একজন পেসার।

সেই এক পেসারে শুরুতেই কোণঠাসা বাংলাদেশ। স্কোরবোর্ডে কোনো রান যোগ করার আগেই ওপেনার সাদমান ইসলামকে ফিরিয়ে দেন আফগান পেসার ইয়ামিন আহমদজাই।

আফগান বোলারদের বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানদের সামনে মনে হচ্ছিল এক একটি যম। শুধু ব্যাট নয়, পুরো শরীর দিয়ে বাঁচাতে হচ্ছে আফগান বোলারদের কাছ থেকে ছুটে আসা বলগুলো। এর মধ্যে এলবিডব্লিউর চান্সও থেকে যায়।

সেই এলবিডব্লিউর শিকারই হন সৌম্য সরকার। সাদমানের বিদায়ের পর জুটি বেঁধে বিপর্যয় কাটানোর চেষ্টা করেছিলেন সৌম্য আর লিটন কুমার দাস। ওয়ানডাউনে লিটনকে মাঠে নামানো ছিল হয়তো একটি বিশেষ পরিকল্পনার অংশ।

৩৮ রানের জুটি গড়ে এ দু’জন অনেকটাই সাবলীল হয়ে ওঠার চেষ্টা করছিলেন। কিন্তু ভুলটা করে বসলেন সৌম্য। মোহাম্মদ নবীর সোজা লেন্থ বলে এলবিডব্লিউর শিকার হয়ে গেলেন বাঁহাতি এই ওপেনার। ৬৬ বলে ১৭ রান করে বিদায় তিনি।

সৌম্য বিদায় নেয়ার পর মুমিনুল হকের সঙ্গে জুটি বাঁধার চেষ্টা করছিলেন লিটন দাস। কিন্তু দলীয় ৫৪ রানের মাথায় রশিদ খানের ঘূর্ণি বলে পুল করতে চেয়েছিলেন লিটন। কিন্তু বল উঠলো না এবং সোজা গিয়ে আঘাত হানলো স্ট্যাম্পে। বোল্ড হয়ে গেলেন তিনি ব্যক্তিগত ৩৩ রানে।

দীর্ঘদিন পর টেস্ট খেলতে নেমে সাকিব আল হাসান শুরুটা করেছিলেন ভালোই। দেখেশুনে ১১ রান পর্যন্ত গেলেন, তারপর রশিদ খানের বল আটকে দিতে গিয়ে মিডল স্ট্যাম্পের বলটা প্যাডে লাগিয়ে বসলেন। হলেন এলবিডব্লিউ। এক বল পর দলের ব্যাটিং ভরসা মুশফিকুর রহীমকেও সাজঘরের পথ দেখালেন রশিদ।

মুশফিক অবশ্য নিজেকে দুর্ভাগা ভাবতেই পারেন। রশিদ খানের ঘূর্ণি ডেলিভারিটি তার ব্যাট ছুয়ে মাটিতে পড়ার সময় বুটের সামনের দিকে লেগে শর্টে দাঁড়ানো ফিল্ডারের হাতে চলে যায়। যদিও রিপ্লেতে পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছিল না, বলটি মাটিতে ছুয়েছে কি না। বল মাটির কাছে যাওয়া সময় কিছু ধুলো উড়তে দেখা যায়। কিন্তু অন ফিল্ড আম্পায়ারের সফট সিগন্যাল আউট হওয়ায় তৃতীয় আম্পায়ার সেটাই বহাল রাখেন। মুশফিক ফেরেন শূন্যতেই।

রশিদের ঘূর্ণিতে এরপর পর্যদুস্ত মাহমুদউল্লাহও। ৭ রান করে বোল্ড হয়ে ফেরেন তিনি। সতীর্থ ব্যাটসম্যানদের এই আসা যাওয়ার মাঝেও একটা প্রান্ত ধরে ছিলেন মুমিনুল হক। দেখেশুনে ক্যারিয়ারের ১৩তম হাফসেঞ্চুরিও তুলে নেন।

কিন্তু সেই হাফসেঞ্চুরির পর আর উইকেটে থাকা হয়নি মুমিনুলের। মোহাম্মদ নবীর ডেলিভারিটি স্লটে পেয়ে মারার মতোই মনে করেছিলেন এই লিটলম্যান। কিন্তু সেটা তেমন ছিল না। কিছুটা নিচু হয়ে যাওয়া বলে ব্যাট চালিয়ে মিড অনে সহজ ক্যাচ দেন ৭১ বলে ৮ বাউন্ডারিতে ৫২ রান করা মুমিনুল। ১৩০ রানেই ৭ উইকেট হারিয়ে ফলোঅনের শঙ্কায় পড়ে বাংলাদেশ।

অষ্টম উইকেট জুটিতে সেই শঙ্কা কাটিয়ে উঠেন মোসাদ্দেক হোসেন সৈকত আর মেহেদী হাসান মিরাজ। যদিও এই জুটিতে উঠে মাত্র ১৬ রান, তবে উইকেটে প্রায় দশ ওভারের মতো সময় কাটিয়েছেন তারা। জুটিটি ভাঙে মিরাজের অতি আত্মবিশ্বাসে। কায়েস আহমেদের লেগ সাইডে পড়া বলটি সুইপ করতে গিয়ে পেছন দিকের স্ট্যাম্প হারান মিরাজ (১১)।

এরপর নবম উইকেটে তাইজুল-মোসাদ্দেকের প্রতিরোধ, যেটি ছিল বাংলাদেশ ইনিংসেরই সবচেয়ে বড় জুটি। এই জুটিটা তৃতীয় দিনের সকালেই ভাঙলো ৫৮ রানে।

এই টেস্টে প্রথম ইনিংসে টস জিতে ব্যাট করতে নেমে ৩৪২ রানের বড় স্কোর গড়ে তোলে আফগানরা। ১০২ রান করে আউট হন রহমত শাহ। ৯২ রান করেন আসগর আফগান এবং শেষ মুহূর্তে ঝড়ো হাফসেঞ্চুরি করেন রশিদ খানও।

তাইজুল ইসলাম ৪১ ওভার বল করে নেন ৪ উইকেট। ২টি করে উইকেট নেন নাইম হাসান এবং সাকিব আল হাসান। ১টি করে নেন মেহেদী হাসান মিরাজ এবং মাহমুদউল্লাহ রিয়াদ।

সংক্ষিপ্ত স্কোর
টস : আফগানিস্তান, ব্যাটিং

আফগানিস্তান ১ম ইনিংস : ৩৪২/১০, ১১৭ ওভার (রহমত শাহ ১০২, আসগর আফগান ৯২, রশিদ খান ৫১, আফসার জাজাই ৪১, ইবরাহিম ২১; তাইজুল ইসলাম ৪/১১৬, সাকিব আল হাসান ২/৬৪, নাঈম হাসান ২/৪৩) । দ্বিতীয় ইনিংস : ২৩৭/৮, ৮৩.৪ ওভার (ইবরাহিম ৮৭, আসগর আফগান ৫০, আফসার জাজাই ৩৪*, রশিদ খান ২৪; সাকিব ৩/৫৩, তাইজুল ২/৬৮, নাঈম হাসান ২/৬১)।

বাংলাদেশ প্রথম ইনিংস : ২০৫/১০, ৭০.৫ ওভার (মুমিনুল ৫২, মোসাদ্দেক হোসেন ৪৮*, লিটন দাস ৩৩, সৌম্য সরকার ১৭; রশিদ খান ৫/৫৫, মোহাম্মদ নবি ৩/৫৬, ইয়ামিন আহমদজাই ১/২১)।