অস্ট্রেলিয়াকে হারিয়ে ২৭ বছর পর ফাইনালে ইংলিশরা


 

বিশ্বের দুই বনেদি শক্তি। দুই চির প্রতিদ্বন্দ্বী। বিশ্বকাপে এসেছিল দু দলই ফেবারিটের তকমা নিয়ে। শুরুটাও দু দলের দুর্দান্ত। কিন্তু স্বাগতিকরা পথ হারিয়ে ফেললেও অস্ট্রেলিয়া ছিল অপ্রতিরোধ্য। শেষ পর্যন্ত দু দলই জায়গা করে নেয় শেষ চারে। আর তাতেই দেখা হয়ে যায় বিশ্ব ক্রিকেটে সবকিছু প্রথমের সাক্ষী এই দু দল।

অনেকের মতে এই ম্যাচটি ছিল এবারের বিশ্বকাপের অঘোষিত ফাইনাল। আর সে ফাইনালে এক রকম খড় খুটোর মত উড়ে গেল গত আসর সহ পাঁচ বারের বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন অস্ট্রেলিয়া। বিশ্বকাপ শুরুর আগে প্রস্তুতি ম্যাচ এবং বিশ্বকাপের রবীন লিগে হারের বদলা নিয়ে ২৭ বছর পর বিশ্বকাপের ফাইনালে ইংল্যান্ড। সবশেষ ১৯৯২ সালে বিশ্বকাপ ফাইনালে খেলেছিল ইংল্যান্ড।

পাঁচ বারের বিশ্বকাপ আয়োজক ইংল্যান্ড চতুর্থ বারের মত বিশ্বকাপের ফাইনালে জায়গা করে নিল। আগের তিনবারে একবারও পারেনি বিশ্বকাপ নামক স্বপ্নের ট্রফিটা নিজেদের করে নিতে। এবারে নিশ্চয়ই সে ভুল আর করবেন না ইংলিশরা।

এবারের বিশ্বকাপের দুটি সেমিফাইনালে যেন দারুণ মিল। আগের ম্যাচটি দুই দিনে গড়ালেও বোলারদের দাপটের কাছে অসহায় ছিল ব্যাটসম্যানরা। বিশেষ করে নিউজ্যিলান্ডের ২৩৯ রানও টপকাতে পারেনি বিশ্বসেরা ব্যাটিং লাইনের ভারত। গতকালও একই অবস্থা হলো। ইংলিশ বোলারদের দাপটের সামনে দাঁড়াতেই পারল না অস্ট্রেলিয়ান ব্যাটসম্যানরা। তাই চ্যাম্পিয়নদের পুঁজিটা ছিল আরো কম, ২২৩ রানের। যদিও জবাব দিতে নেমে সে মামুলি টার্গেটটাকে নিতান্তই মামুলি বানিয়ে দিয়েছিল দুই ইংলিশ ওপেনার। আর তাতেই ৮ উইকেটের সহজ জয় দিয়ে ফাইনালে জায়গা করে নেয় স্বাগতিক ইংল্যান্ড।

অস্ট্রেলিয়াকে যেন পাড়ার কোন দলে পরিণত করল ইংল্যান্ড। তারা যে পাঁচ বারের বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন সেটা মনেই হয়নি অস্ট্রেলিয়ার পারফরম্যান্স দেখে। ওকস, অর্চার. আদিল রশিদদের পথে হাঁটতে পারেননি স্টার্ক-কামিন্স-লিয়নরা। অসি বোলারদের কতটা দৈন্য ছিল সেটা স্পষ্ট হয় যখন স্টিভেন স্মিথকে বল হাতে আসতে হলো। নিজেদের কন্ডিশনের ফায়দাটা বেশ ভালই তুলে নিয়ে আবার ফাইনালে ইংল্যান্ড।

মরগ্যানের দলকে অনুপ্রেরণা দিতে গতকাল বিশ্বকাপের জার্সি গায়ে মাঠে হাজির ছিলেন ১৯৯২ বিশ্বকাপের ফাইনাল খেলা ইংল্যান্ড দলের ক্রিকেটাররা। অগ্রজদের উপস্থিতিকে দারুন সম্মান দিল মরগ্যানের দল। তবে লিগ পর্বের শেষ ম্যাচে দক্ষিণ আফ্রিকার কাছে হেরে যে ধাক্কাটা খেয়েছিল অস্ট্রেলিয়া সে ধকল যেন কাটিয়ে উঠতে পারল না। সে ম্যাচে হারের সাথে অস্ট্রেলিয়া হারিয়েছিল দুই গুরুত্বপূর্ন ক্রিকেটারকে। সে সব বাধা কাটিয়ে উঠা সম্ভব হলো না অ্যারন ফিঞ্চের দলের। ব্যাট হাতে ব্যর্থ হলেন দুর্দান্ত ক্রিকেট খেলতে থাকা ওয়ার্নার-ফিঞ্চ। বল হাতে আগুন ঝরাতে পারলেন না সর্বোচ্চ উইকেট শিকারি স্টার্ক।

অপরদিকে অর্চার-ওকসরা বল হাতে আগুন ঝরানোর পর জেসন রয়-মরগ্যানরা ব্যাট হাতে দায়িত্বটা পালন করেছেন একেবারে সুচারু রূপে। আর তাতেই ২৭ বছর পর আরেকবার ফাইনালের স্বপ্ন পূরণ হলো ক্রিকেটের জনক ইংলিশদের। গত দুই বছর ধরে যে অপ্রতিরোধ্য ক্রিকেট খেলছিল ইং্যলান্ড তারই সফল রূপটা দেখাল তারা বিশ্বকাপে। ১৪ জুলাই ক্রিকেটের মক্কা লর্ডসের ঐতিহাসিক ব্যালকনিতে স্বপ্নের বিশ্বকাপ হাতে কে দাড়াবেন ইয়ন মরগ্যান নাকি কেন উইলিয়ামসন ? সে প্রশ্ন না হয় তোলাই থাকল।

বার্মিংহামের এজবাস্টনে টসে জিতে ব্যাট করতে নামা অস্ট্রেলিয়ার শুরুটা হয় একেবারে দুঃস্বপ্নের মত। বলা যায় অস্ট্রেলিয়ার ফাইনালে যাওয়ার স্বপ্নটাকে দুঃস্বপ্নে পরিণত করেন দুই ইংলিশ বোলার ক্রিস ওকস এবং জোফরা অর্চার। পরপর দুই ওভারে এই দুই পেসার ফেরান অস্ট্রেলিয়ার দুই ভরসা এবং ওপেনার অ্যার ফিঞ্চ এবং ডেভিড ওয়ার্নারকে। রানের খাতা খোলার আগে ফিঞ্চকে এলবিডব্লিউর ফাঁদে ফেলে প্রথম ধাক্কাটা দেন অর্চার। এরপর ৯ রান করা ওয়ার্নারকে ফেরান ওকস। সে ধাক্কা না সামলাতেই আবার ওকসের আঘাত। এবার তার শিকার সেমিফাইনালের জন্য উড়িয়ে আনা হ্যান্ডসকম্ব। ১৪ রানে ৩ উইকেট হারিয়ে খাদের কিনারায় চলে যাওয়া অস্ট্রেলিয়াকে এরপর টেনে তোলার চেষ্টা করেন স্টিভেন স্মিথ এবং উইকেট রক্ষক অ্যালেঙ ক্যারি। এ দুজনের ১০৩ রানের জুটি ভাঙ্গেন আদিল রশিদ। এবার রশিদের জোড়া আঘাত। যার প্রথম শিকার ৭০ বলে ৪৬ রান করা ক্যারি। ওভারের শেষ বলে স্টয়নিসকে রানের খাতাও খুলতে দেননি রশিদ।

রশিদের মায়াবী ঘূর্ণিতে একই ওভারে দুই উইকেট হারিয়ে আবার লন্ডভন্ড হয়ে যায় চ্যাম্পিয়নদের ব্যাটিং। পুরো বিশ্বকাপে ব্যর্থ মেস্কওয়েল এ ম্যাচেও পারলেন না জ্বলে উঠতে। ৩৯ রানের এই জুটিটা ভাঙ্গেন অর্চার ২২ রান করা মেঙওয়েলকে ফিরিয়ে। প্যাট কামিন্সকেও ব্যাটসম্যান হতে দিলেন না আদিল রশিদ। তবে মিচেল স্টার্ককে নিয়ে আবার প্রতিরোধের চেষ্টা করেছিলেন স্মিথ। কিন্তু এবার নিজেই রণে ভঙ্গ দিলেন স্মিথ। তাও রান আউটের শিকার হয়ে। তবে ফিরে আসার আগে ৮৫ রান করে আসেন সাবেক এই অধিনায়ক। তার ১১৯ বলের ইনিংসটিতে ছিল ৬টি চারের মার। এরপর আর পুরো ৫০ ওভারও খেলতে পারেনি অস্ট্রেলিয়া। মিচেল স্টার্কের ২৯ রান নাহলে দুইশ রানের আগেই হয়তো থামতে হতো অস্ট্রেলিয়াকে। শেষ পর্যন্ত অস্ট্রেলিয়া যে ২২৩ রান করতে পেরেছে সেটা স্টার্কের ২৯ রানের সুবাধে। ইংল্যান্ডের পক্ষে সফল বোলার ক্রিস ওকস নিয়েছেন ২০ রানে ৩ উইকেট। পেসারদের রাজত্বের দিনে আদিল রশিদও নিয়েছেন ৩ উইকেট। আর জোফরা অর্চার নিয়েছেন ২ উইকেট।

২২৪ রানের মামুলি লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে শুরুতেই ঝড় তোলেন দুই ইংলিশ ওপেনার জেসন রয় এবং জনি বেয়ারেস্টো। বেয়ারেস্টো কিছুটা রয়েসয়ে খেললেও ব্যাট হাতে অসি বোলারদের কচু কাটা করেছেন জেসন রয়। মাত্র ১৭.২ ওভারে ১২৪ রান তুলে নেন এ দুজন। স্টার্কের বলে এলবিডব্লিউ হয়ে বেয়ারেস্টো ফিরলে ভাঙ্গে এ জুটি। প্রথশ পাওয়ার প্লেতে যেখানে অস্ট্রেলিয়ান ব্যাটসম্যানরা রানের জণ্য মাথা কুড়ে মরেছে সেখানে রানের বন্যা বইয়ে দিয়েছে ইংল্যান্ডের ওপেনাররা। ৪৩ বলে ৩৪ রান করে ফিরেন বেয়ারেস্টো। তবে পার্টনারকে হারানোর পর আর বেশিক্ষণ থাকতে পারেননি জেসন রয়। প্যাট কামিন্সের বেরিয়ে যাওয়া বলটিকে হুক করতে চেয়েছিলেন জেসন রয়। কিনন্তু বল ব্যাটে ছোঁয় লাগিয়ে জমা পড়ে উইকেট রক্ষক ক্যারির হাতে। ফিরেন ঝড় তোলা জেসন রয়। সেঞ্চুরির আশা জাগিয়েও ফিরতে হয় এই ওপেনারকে। মাত্র ৬৫ বলে ৮৪ রানের ইনিংসটিতে ৯টি চারের পাশাপাশি ছক্কার মার ছিল ৫টি। দুই ওপেনার ফিরলেও জো রুটকে নিয়ে অধিনায়ক ইয়ন মরগ্যান একেবারে নির্বিঘ্নে দলকে পৌছে দেন ফাইনালে। পুরো ১৭ ওভার এবং ৫ বল হাতে রেখে অস্ট্রেলিয়াকে বিদায় করে চতুর্থবারের মত বিশ্বকাপের ফাইনালে ইংল্যান্ড। অবিচ্ছিন্ন ৭৯ রানের জুটি গড়ে ম্যাচ শেষ করেন এ দুজন। রুট ৪৯ এবং মরগ্যান অপরাজিত ছিলেন ৪৫ রানে।

নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না, তবে এটা বলা যাচ্ছে—রবিবার বিশ্বকাপ ক্রিকেট পেতে যাচ্ছে নতুন এক চ্যাম্পিয়নকে। বৃষ্টিতে বিঘ্নিত, একঘেয়েমিতে আক্রান্ত, দীর্ঘায়ুতে ক্লান্ত ২০১৯ বিশ্বকাপ শেষ পর্যন্ত একটা কাজের কাজ করে যাচ্ছে। উপহার দিচ্ছে ষষ্ঠ বিশ্বচ্যাম্পিয়নকে।