সুন্দরবনে অবাধে চলছে হরিণ শিকার


সুন্দরবনের সাতক্ষীরা রেঞ্জে বেপরোয়া হয়ে উঠেছে হরিণ শিকারিরা। সুন্দরবনের হরিণ বাঘের থাবা ও বনদুস্যদের হাত থেকে রক্ষা পেলেও শিকারিদের ফাঁদ ও বন্দুকের গুলি থেকে রেহাই পাচ্ছে না।

বনবিভাগ ও কোস্ট গার্ডের সদস্যরা অভিযান চালিয়ে সুন্দরবনে গহীনে চলতি মাসে তিনটি মৃত হরিণ, লাইসেন্সধারী তিনটি একনলা বন্দুক, একটি নৌকা ও দু’জন হরিণ শিকারিকে আটক করলেও প্রকৃত শিকারিরা রয়ে গেছে ধরা-ছোঁয়ার বাইরে।

তথ্যানুসন্ধানে জানা গেছে, সুন্দরবনে বনদস্যু অনেকটা কমে গেলেও হরিণ শিকারিদের চক্র বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার মুন্সীগঞ্জ, কৈখালী ভেটখালী, যতিন্দ্র নগর, মরাগাংসহ ইউনিয়নের গ্রামগুলোতে প্রতিনিয়ত বিক্রি হচ্ছে হরিণের মাংস। দিন দিন এই প্রবণতা বেড়েই চলেছে।

তবে বনবিভাগের দাবি, শিকারিদের বিরুদ্ধে তাদের অভিযান অব্যহত রয়েছে।

স্থানীয়রা বলছে, ভোজন বিলাসী মানুষের কাছে হরিণের মাংসের ব্যাপক কদর রয়েছে। এ কারণে এ মাংস ৫শ’ থেকে ৬শ’ টাকা কেজি দামে কিনতে তারা দ্বিধাবোধ করেন না।

এলাকাবাসীর অভিযোগ, হরিণের চোরা শিকারি ও মাংস ব্যবসায়ীদের তালিকা প্রশাসনের কাছে থাকলেও সেসব শিকারি ও ব্যবসীদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয় না। এসব শিকারি ও মাংস ব্যবসায়ীরা বিশেষ করে বনবিভাগ ও থানা প্রশাসনকে ম্যানেজ করে ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। আর এসব কারণে প্রশাসন দেখেও না দেখার ভান করে থাকে।

সচেতন মহলের অভিযোগ, বনবিভাগের কতিপয় অসাধু কর্মকর্তা উৎকোচের মাধ্যমে সুন্দরবনে নিষিদ্ধ অভয়ারণ্য এলাকায় চোরা শিকারিদের ও জেলে বাওয়ালিদের সুযোগ করে দেওয়ায় সুন্দরবনের হরিণ আজ শেষ হয়ে যাচ্ছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক ব্যক্তি জানান, স্থানীয় কোটিপতি চিংড়ি ঘের ব্যবসায়ী সাত্তার মোড়ল সুন্দরবনের হরিণ শিকারিদের গডফাদার। প্রায়ই তিনি তার নিজস্ব ট্রলার নিয়ে সুন্দরবনের ভেতর হরিণ শিকার করতে বের হন।

সেই সঙ্গে হরিণ শিকারিরা আটক হলে তাদেরকে ছাড়িয়ে আনার সব দায়িত্বও নেন এই সাত্তার মোড়ল।

গত ৯ জুলাই সাত্তার মোড়লের নেতৃত্বে সুন্দরবনের চুনকুড়ি এলাকায় হরিণ শিকারে যান একটি শিকারি চক্র। তাদের সাথে সাতক্ষীরার শ্যামনগর থানার একজন সাব-ইন্সপেক্টর ও কয়েকজন পুলিশের কনস্টেবলও ছিলেন।

বিষয়টি জানতে পেয়ে বন বিভাগ ও কোস্টগার্ড অভিযান চালিয়ে তাদেরকে শিকার করা তিনটি হরিণ, তিনটি অস্ত্রসহ আটক করে। পরবর্তী সময়ে কোটিপতি সাত্তার মোড়ল ও পুলিশ সদস্যরা মুক্তি পায়। কিন্তু বিভিন্ন গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এ ঘটনা ছড়িয়ে পড়লে পুলিশ বাধ্য হয়ে সাত্তার মোড়লসহ ৬ জনের নামে শ্যামনগর থানায় মামলা রেকর্ড করে।

এ ব্যাপারে চিংড়ি ঘের ব্যবসায়ী সাত্তার মোড়লের সাথে যোগাযোগ করে তাকে পাওয়া যায়নি।

এ বিষয়ে সাতক্ষীরা রেঞ্জ কর্মকর্তা জিএম রফিক আহমেদ জানান, বনবিভাগের পক্ষ থেকে কেউ কোনো উৎকোচ নেয় না। যদি এরকম কোনো সুনির্দিষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায় তাহলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। সুন্দরবনে টহল জোরদার করা হয়েছে যাতে হরিণ শিকারিরা পার পেয়ে যেতে না পারে।

সম্প্রতি গোপন সংবাদের ভিত্তিতে সুন্দরবনে অভিযান চালিয়ে একটা নৌকা,তিনটি মৃত হরিণ, তিনটি বন্দুক ও দু’জন হরিণ শিকারি, শ্যামনগর থানার সশস্ত্র কয়েকজন পুলিশকে আটক করা হয়। এ সময় পুলিশ তাদের অভিযানের সিসি এবং সিজার লিস্ট দেখালে তাদের ছেড়ে দেওয়া হয় বলেও জানান রফিক।

তবে শ্যামনগর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সৈয়দ মান্নান আলী জানান, সুন্দরবনে বনদুস্যদের ধরার জন্য পুলিশের অভিযান অব্যাহত রয়েছে। উৎকোচ গ্রহণের বিষয়টি সঠিক নয়।